৩৭ বছর পরেও ঘুচল না অভিশাপ! কাশ্মীর উপত্যকায় কি আর ফিরতে পারবেন না পণ্ডিতরা?

কাশ্মীরি পণ্ডিতদের विस्थापन বা বাস্তুহারা হওয়ার বেদনা তিন দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও পুরোপুরি মুছে যায়নি। বিশিষ্ট নেতা টিকা লাল টপলুর পুণ্যতিথিতে জম্মুতে কাশ্মীরি পণ্ডিত সমাজ একটি বিশাল মশাল মিছিল বের করে তাঁদের পুরনো ক্ষত ও বঞ্চনার ইতিহাসকে পুনরায় স্মরণ করেছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সরকারের কাছে উপত্যকায় তাঁদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন এবং স্থায়ী পুনর্বাসনের জন্য সুনির্দিষ্ট ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কাশ্মীর তাঁদের কাছে নিছক এক টুকরো জমি নয়, বরং তাঁদের আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি এবং পূর্বপুরুষদের স্মৃতিবিজড়িত আদি ভিটেমাটি।

শুরু হয়েছিল যে কালো অধ্যায় থেকে:
কাশ্মীরি পণ্ডিত সম্প্রদায়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসবাদীরা কাশ্মীরেই টিকা লাল টপলুকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তাঁকে উপত্যকায় জঙ্গি সন্ত্রাসের প্রথম দিকের অন্যতম প্রধান শিকার হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর এই হত্যাকাণ্ডের পরই কাশ্মীর উপত্যকায় উগ্রপন্থার প্রভাব হু হু করে বৃদ্ধি পায়। যার পরিণতিস্বরূপ পরবর্তীতে হাজার হাজার কাশ্মীরি পণ্ডিতকে নিজেদের পৈতৃক ভিটেমাটি ও সম্পত্তি ফেলে রেখে উপত্যকা ছেড়ে ভিনরাজ্যে আশ্রয় নিতে বাধ্য হতে হয়।

প্রতি বছর টিকা লাল টপলুর প্রয়াণ দিবসটি কাশ্মীরি পণ্ডিতদের কাছে গভীর শোক ও আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। চলতি বছরে জম্মুতে আয়োজিত মশাল মিছিলটি সেই দীর্ঘদিনের বেদনা ও বাস্তুচ্যুতির ইতিহাসকে ফের এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।

৩৭ বছর পরেও প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষা:
দেশভাগের চেয়েও মর্মান্তিক এই विस्थापनाর শিকার মানুষেরা জানাচ্ছেন যে, তিন দশকেরও বেশি সময় কেটে গেলেও তাঁরা আজও নিজেদের ঘরে ফেরার আশায় দিন গুনছেন। সমাজের বিভিন্ন মহলের মানুষের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাত্রায় নানা পরিবর্তন এলেও, নিজ জন্মভূমিতে সসম্মানে ও নিরাপদে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আজও তাঁদের এতটুকু ম্লান হয়নি।

মশাল মিছিলে অংশ নেওয়া মানুষেরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, এই विस्थापन বা উচ্ছেদ কেবল ঘর হারানোর যন্ত্রণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বহু পরিবারকে তাঁদের চিরপরিচিত জমিজমা, স্থাবর সম্পত্তি, সামাজিক পরিমণ্ডলী এবং শৈশব-কৈশোরের সোনালী স্মৃতিগুলো পিছনে ফেলে পালিয়ে আসতে হয়েছিল। আর ঠিক এই কারণেই নিজের মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার এই দাবিটি তাঁদের কাছে এক প্রবল আবেগঘন ও অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

‘কাশ্মীর আমাদের পরিচয় ও চিরকালীন মাতৃভূমি’:
কাশ্মীরি পণ্ডিত সমাজের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তাঁদের শারীরিক অস্তিত্ব বহু বছর আগে কাশ্মীর উপত্যকার বাইরে চলে এলেও তাঁদের মন ও আত্মা আজও সেই উপত্যকার সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। তাঁরা কাশ্মীরকে মহর্ষি কশ্যপের পবিত্র ভূমি এবং তাঁদের পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস বলে মনে করেন।

সম্প্রদায়ের দাবি, একমাত্র সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশ এবং আত্মসম্মানের সঙ্গে নিজভূমিতে পুনর্বাসনই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান হতে পারে। এর জন্য সরকারের তরফ থেকে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট, স্বচ্ছ এবং কার্যকর পুনর্বাসন নীতি রূপায়ণ করা অত্যন্ত জরুরি।

স্বতন্ত্র ও সুরক্ষিত অঞ্চলের জোরালো দাবি:
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের মূল দাবিগুলির মধ্যে উপত্যকায় তাঁদের জন্য একটি আলাদা এবং সম্পূর্ণ সুরক্ষিত অঞ্চল গড়ে তোলার দাবিও রয়েছে। সমাজের একাধিক সংগঠনের জোরালো দাবি, কাশ্মীরি পণ্ডিতদের জন্য এমন একটি বিশেষ নিরাপদ জোন বা পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মতো ব্যবস্থা করা হোক, যেখানে তাঁরা ন্যূনতম ভয় বা আশঙ্কার মুখোমুখি না হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজেদের জীবন পুনরায় নতুন করে শুরু করতে পারেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *