‘কম্প্রোমাইজ না করলে অ্যাটেনডেন্স নয়!’ সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজে কানকাটা দেবুর তাণ্ডব ও ছাত্রীদের বিস্ফোরক অভিযোগে শোরগোল

মাস তিনেক আগে সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজের (Surendranath Law College) ইউনিয়ন রুম থেকে বিলাসবহুল খাট, বিছানা ও অ্যাটাচড বাথরুম উদ্ধারের ঘটনায় গোটা রাজ্যজুড়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। সেই সময়ই প্রথম প্রকাশ্যে এসেছিল কুখ্যাত দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় তথা ‘কানকাটা দেবু’র নাম। আর এবার সেই কানকাটা দেবু এবং তাঁর অনুগামীদের বিরুদ্ধে আরও একধাপ এগিয়ে সরাসরি ছাত্রীদের হেনস্থা ও চরম অসদাচরণের বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন কলেজের পড়ুয়ারা। সম্প্রতি কলেজের উপস্থিতির হার বা অ্যাটেনডেন্স নিয়ে বিক্ষোভ, ভাইস প্রিন্সিপালকে ঘেরাও এবং তাঁর পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে কলেজ চত্বর। এই সমস্ত বিতর্কের মাঝেই আবারও নতুন করে সামনে এসেছে কানকাটা দেবুর নাম। রাজনৈতিক প্রভাবকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে একসময়ে সুরেন্দ্রনাথ কলেজকে গাজোয়ারির আখড়া বানিয়ে তোলা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
ছাত্রীদের কম্প্রোমাইজ করার হুমকি!
টিভি ৯ বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলেজের এক ক্ষুব্ধ ছাত্রী বিস্ফোরক অভিযোগ করে জানান যে, দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর ছেলে শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়মিত ছাত্রীদের হেনস্থা করতেন। তৃণমূল জমানার দাপট দেখিয়ে ছাত্রীদের বারবার নানা বিষয়ে ‘কম্প্রোমাইজ’ করার জন্য চাপ দেওয়া হতো।
ঠিক কী ধরনের কম্প্রোমাইজ করতে বলা হতো? ছাত্রীদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যদি তাঁরা কথা না শোনেন বা কম্প্রোমাইজ না করেন, তবে কলেজে তাঁদের অ্যাটেনডেন্স বা উপস্থিতির নম্বর দেওয়া হবে না। দেবাশিস ও শিবাশিস কলেজের গেটের সামনেই বসে থাকতেন এবং কোনো ছাত্রী কলেজে ঢুকলেই নাম ধরে জেরা করা হতো। ভয়ে সেই সময় কলেজের উপাধ্যক্ষ বা ভাইস প্রিন্সিপালও ওই দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পেতেন না। শুধু তাই নয়, একটি স্বনামধন্য ল কলেজে ছাত্রীদের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ওই ছাত্রী আরও জানান যে, গার্লস বাথরুমে ছিটকিনি পর্যন্ত নেই, ফলে বাথরুমে যেতে হলেও সহপাঠীকে সঙ্গে নিয়ে পাহারা দিতে হয়। পরিকাঠামোর নামে দেদার টাকা তোলা হলেও তার ছিটেফোঁটাও যে উন্নয়নমূলক কাজে খরচ হয়নি, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন পডু়য়ারা।
উপাধ্যক্ষের পদত্যাগ বিতর্ক ও চাঞ্চল্যকর মোড়
এদিকে এই পুরো পরিস্থিতির মধ্যেই সুরেন্দ্রনাথ আইন কলেজের উপাধ্যক্ষ মহম্মদি তরন্নুমকে জোর করে পদত্যাগপত্রে সই করানোর চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। যদিও উপাধ্যক্ষের দাবি, তিনি স্বেচ্ছায় ইস্তফা দেননি এবং তিনি আবারও কলেজে ফিরবেন। অন্যদিকে, ছাত্র-ছাত্রীরা উপাধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছেন। সোমবার পড়ুয়াদের আয়োজিত একটি সাংবাদিক বৈঠকে তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, তাঁদের এই আন্দোলন কোনোভাবেই বার কাউন্সিলের ৭৫ শতাংশ উপস্থিতির নিয়ম বা ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার জন্য নয়। বরং এই প্রতিবাদ কলেজের চরম প্রশাসনিক অযোগ্যতা, আর্থিক শোষণ ও পরিকাঠামোগত দুর্নীতির বিরুদ্ধে।
ছাত্রদের হিসেব অনুযায়ী, কলেজে সাতশোর বেশি শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও মাত্র ১০ থেকে ১৫ জন কলিজিয়েট হয়েছেন এবং বাকিরা ডিস-কলিজিয়েট! ইআরপি মডিউলের সমস্ত অ্যাক্সেস ভাইস প্রিন্সিপালের হাতে থাকায় ডিজিটাল এন্ট্রিতে ব্যাপক কারচুপি করা হয়েছে বলে তাঁদের জোরালো দাবি। সকাল সাড়ে ছটায় ক্লাস থাকলেও অনেক সময় সাতটার আগে কলেজের গেটই খোলা হয় না, ফলে ইচ্ছে করেই ছাত্র-ছাত্রীদের হাজিরা কমিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
পড়ুয়াদের মূল দাবিগুলি এক নজরে:
প্রশাসনিক অযোগ্যতা ও দুর্নীতির দায়ে অবিলম্বে ভাইস প্রিন্সিপালের পদত্যাগ নিশ্চিত করতে হবে।
ডিজিটাল এন্ট্রিতে কোনো ধরনের কারচুপি বরদাস্ত করা হবে না।
উপস্থিতির সমস্ত ফিজিক্যাল রেকর্ড জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
অন্যান্য সরকারি ল কলেজের সমতুল্য করতে হবে বর্তমান ফি কাঠামো।
কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলবে না।
সব মিলিয়ে, কানকাটা দেবুর অন্ধকার ছায়া এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির অভিযোগে সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজের অন্দরের পরিস্থিতি এখন চরম উত্তপ্ত।