এক কলমে ছাঁটাই সাড়ে পাঁচশো কর্মী! মহারাষ্ট্রের মন্ত্রীদের অফিসে এই কড়া পদক্ষেপে কিসের ইঙ্গিত?

মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে এক বিরাট ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে গেছে। রাজ্যের মন্ত্রী ও উপমুখ্যমন্ত্রীদের কার্যালয়গুলিতে নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বেআইনি বা নিয়মবহির্ভূতভাবে নিযুক্ত প্রায় ৫৫০ জন কর্মী ও আধিকারিককে তাঁদের নিজ নিজ মূল বিভাগে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই বরখাস্ত হওয়া কর্মীদের মধ্যে অন্য বিভাগ থেকে সাময়িকভাবে বদলি হওয়া কর্মী, আউটসোর্স বা বাহ্যিক উপায়ে কর্মরত ব্যক্তি এবং শুধুমাত্র মৌখিক আদেশের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালনকারী আধিকারিকরাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। হঠাৎ করে এত বিপুল সংখ্যক কর্মী একসঙ্গে সরে যাওয়ায় একাধিক মন্ত্রীর দপ্তরের দৈনন্দিন কাজকর্ম বড়সড় ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কী ছিল পুরো প্রশাসনিক পটভূমি?
রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর প্রথা অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রী, উপমুখ্যমন্ত্রী এবং বিভিন্ন মন্ত্রীদের কার্যালয় পরিচালনার জন্য একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বা সাময়িক পদের রূপরেখা তৈরি করা হয়। বর্তমান মহাযুতি সরকার মন্ত্রী দপ্তরগুলির জন্য মোট ৯০৪টি সাময়িক পদের অনুমোদন দিয়েছিল। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী কার্যালয়ের (CMO) তরফ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা করা হয়, যেখানে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে।
দেখা যায়, রাজ্যের প্রায় ৪০টি মন্ত্রী কার্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৫৪৯টি পদে নিয়মমাফিক নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়োগ করা হয়েছিল। এর বাইরেও প্রায় ৫৫০ জন অতিরিক্ত কর্মী বিভিন্ন মাধ্যম ও শর্টকাট পদ্ধতিতে কোনো রকম আইনি বা দাপ্তরিক প্রক্রিয়া ছাড়াই মন্ত্রীদের দপ্তরে দিব্যি কাজ করে যাচ্ছিলেন।
২৫ আগস্ট জারি হয়েছিল কড়া নির্দেশিকা
এই অনিয়ম রুখতে গত ২৫ আগস্ট রাজ্য সরকারের সাধারণ প্রশাসন বিভাগ থেকে একটি কড়া সরকারি আদেশ (Government Resolution) জারি করা হয়। ওই আদেশে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, আগামী ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে সমস্ত অবৈধ বা অনিয়মিতভাবে নিযুক্ত কর্মী ও আধিকারিকদের বাধ্যতামূলকভাবে তাদের মূল বিভাগে ফেরত পাঠাতে হবে। এমনকি এই নির্দেশ অমান্য করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বেতন পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়ার চরম সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছিল।
নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হতেই মুখ্যমন্ত্রী কার্যালয় সরাসরি এই পুরো প্রক্রিয়াটির ওপর কড়া নজরদারি চালায়। মুখ্যমন্ত্রী কার্যালয়ের বিশেষ কার্যনির্বাহী আধিকারিক (OSD) চন্দ্রশেখর ভাজে বিভিন্ন মন্ত্রীর দপ্তর থেকে কর্মীদের বর্তমান পরিস্থিতির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন এবং শেষ পর্যন্ত নিয়মের বাইরে থাকা সমস্ত কর্মীকে অব্যাহতি দিয়ে মূল বিভাগে ফেরত পাঠানো হয়।
কেন অতিরিক্ত স্টাফের প্রয়োজন হতো মন্ত্রীদের?
প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, মন্ত্রীদের কার্যালয়গুলিতে অফিশিয়ালি যে সীমিত সংখ্যক স্টাফ বরাদ্দ থাকে, তা দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজের পাহাড় সামলানোর জন্য সবসময় যথেষ্ট হয় না। বিধানসভার নানান প্রশ্নের জবাব তৈরি করা, বিভিন্ন বিভাগীয় মামলার শুনানি সামলানো, জরুরি ফাইলগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা এবং নিজেদের নির্বাচনী এলাকার সাধারণ মানুষের কাজ সামলানোর জন্য অতিরিক্ত কর্মীর প্রয়োজন পড়েই।
আর এই প্রয়োজনের খাতিরেই বহু মন্ত্রী অন্য সরকারি বিভাগ থেকে নিজেদের সুবিধার্থে অস্থায়ীভাবে একাধিক আধিকারিক ও কর্মচারীকে নিজেদের দপ্তরে নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু সরকারের এই হঠাৎ কড়া পদক্ষেপে সেই পুরোনো ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ দাঁড়ি পড়ে গেল। এখন থেকে মন্ত্রীদের তাঁদের নির্দিষ্ট কোটার নির্ধারিত স্টাফ নিয়েই সমস্ত কাজকর্ম পরিচালনা করতে হবে।
মহাযুতি জোটের তিন দলের মন্ত্রীরাই প্রভাবিত
প্রায় ৫৫০ জন কর্মীর এই আকস্মিক বিদায়ের ফলে শাসক জোট মহাযুতি (Mahayuti)-র তিনটি শরিক দলেরই মন্ত্রীরা কমবেশি সমস্যায় পড়েছেন। বাদ পড়েননি উপমুখ্যমন্ত্রীদের দপ্তরগুলিও। জানা গেছে, খোদ চারজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর একান্ত সচিব বা প্রাইভেট সেক্রেটারি (PS)-দেরও নিজেদের দপ্তর ছেড়ে মূল বিভাগে ফিরে যেতে হয়েছে।
সরকারের এই হঠাৎ একতরফা ও কড়া পদক্ষেপে বিভিন্ন মহলে গুঞ্জন শুরু হয়েছে এবং একাধিক মন্ত্রী অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে খবর। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই ঘটনার ফলে ভবিষ্যতে মন্ত্রী দপ্তরগুলিতে যেকোনো নিয়োগের ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী কার্যালয়ের তদারকি এবং নিয়ন্ত্রণ যে আরও বহু গুণে কড়া হবে, তা বলাই বাহুল্য।