৭ বছর পর ভারতে আসছেন শি জিনপিং! ব্রিকস সামিটে মোদি-জিলাপং ঐতিহাসিক সাক্ষাতে কি বরফ গলবে?

চলতি বছরে নতুন দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে চলা ১৮তম ব্রিকস (BRICS) শিখর সম্মেলনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এখন থেকেই চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই মেগা ইভেন্টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে চলেছে ভারত ও চিনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। দীর্ঘ প্রায় ৭ বছর পর ভারতে পা রাখতে চলেছেন চিনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং। বিশেষ করে ২০২০ সালের সংঘাতপূর্ণ গালওয়ান উপত্যকার ঘটনার পর এটাই তাঁর প্রথম ভারত সফর। স্বাভাবিকভাবেই এই ঐতিহাসিক সম্মেলনে গোটা বিশ্বের নজর থাকবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং শি জিনপিংয়ের হাই-ভোল্টেজ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের দিকে। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের এই মেগা বৈঠকে সীমান্ত বিতর্ক, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং ব্রিকস মঞ্চের ভবিষ্যৎ কৌশল প্রধান আলোচ্য বিষয় হতে চলেছে।

এলএসি (LAC) ও সীমান্ত স্থিতাবস্থা: আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু
ভারত ও চিনের বর্তমান কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি (LAC)-র বর্তমান পরিস্থিতি সবচেয়ে সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর ইস্যু। গালওয়ান সংঘর্ষের পর থেকেই দুই দেশের কूटनीतिक, অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কে গভীর ফাটল দেখা দিয়েছিল। সীমান্ত উত্তেজনার জেরে দীর্ঘ সময় ধরে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা কার্যত স্তব্ধ ছিল।

তবে গত কয়েকমাসে দুই দেশের সেনাবাহিনী পর্যায়ে সৈন্য অপসারণ (Disengagement) এবং একাধিক কূটনৈতিক আলোচনার পর বরফ গলতে শুরু করেছে। সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই গত মাসে বেজিংয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং চিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র মধ্যে অত্যন্ত ফলপ্রসূ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যাকে কূটনৈতিক মহলে একটি বড় ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে দুই পক্ষই সীমান্ত অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখা, সামরিক হটলাইন ব্যবস্থা সক্রিয় করা এবং কমান্ডার স্তরের যোগাযোগ আরও পোক্ত করার বিষয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ভারতের পক্ষ থেকে বরাবরই অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, সীমান্ত পারাপারে শান্তি ও স্থিতাবস্থা ফিরে না এলে ভারত-চিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া অসম্ভব।

বাণিজ্য ঘাটতি ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ
অর্থনৈতিক মোর্চায় ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি। বর্তমানে ভারত ও চিনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৫১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও, এর মধ্যে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি এক বিশাল অংকের অর্থাৎ প্রায় ১১২ বিলিয়ন ডলার। এই বৈঠকে ভারত জোরালোভাবে চিনের বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বিপুল এই বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের জোরালো দাবি জানাতে পারে। অন্যদিকে, চিনের পক্ষ থেকেও ভারতে তাদের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিধি বৃদ্ধি এবং চিনা সংস্থাগুলির জন্য আরও সহজ ও সাবলীল ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরির দাবি ওঠার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

সরাসরি উড়ান, ভিসা এবং কৈলাশ मानसरोवर যাত্রা
দুই দেশের সাধারণ মানুষের যোগাযোগের পথ সুগম করতে সরাসরি বিমান পরিষেবা (Direct Flights), পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের জন্য সহজতর ভিসা নীতি এবং বহুচর্চিত কৈলাশ मानसरोवर যাত্রা পুনরায় শুরু করার বিষয়গুলি নিয়ে বড়সড় অগ্রগতির আশা করা হচ্ছে। এর ফলে দুই দেশের সাধারণ নাগরিকদের যাতায়াত এবং সীমান্ত বাণিজ্য ফের চাঙ্গা হতে পারে।

ব্রিকস মঞ্চে বহুমুখী অর্থনৈতিক সহযোগিতা
ব্রিকস সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক স্তরেও ভারত ও চিন স্থানীয় মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য পরিচালনা, ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের সমন্বয়, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (MSME) ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা, বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করা, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করার পথে অনেকটাই এগোতে পারে। উল্লেখ্য, আগামী ২০২৭ সালে ব্রিকস গোষ্ঠীর সভাপতিত্ব গ্রহণ করবে চিন। সেই প্রেক্ষাপটে সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল এবং আগামী বছরের নির্দিষ্ট অগ্রাধিকারগুলি নিয়ে এই বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় হতে পারে।

কোন বড় চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে?
যদিও এই বৈঠকের প্রাক্কালে বড় কোনো দ্বিপাক্ষিক মেগা চুক্তির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সিলমোহর পড়েনি, তবুও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মিলতে পারে সমাধান সূত্র:

সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সুদৃঢ় করতে নতুন কনফিডেন্স বিল্ডিং মেজার্স (CBM)।

দীর্ঘমেয়ায়ী সীমান্ত বিরোধ আলোচনার টেবিলে আরও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যৌথ সদিচ্ছা।

স্ট্র্যাটেজিক ইকোনমিক ডায়লগ (Strategic Economic Dialogue) পুনরায় চালুর সম্ভাবনা।

বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগের পথ সুগম করার রূপরেখা।

দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল এবং ভিসা নীতি সহজ করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।

সব মিলিয়ে, বর্তমান ভারত-চিন সম্পর্ক এক অত্যন্ত সতর্ক ও হিসাব কষা উন্নয়নের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়লেও সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে সম্পর্কে আমূল পরিবর্তন আসা সহজ নয়। ব্রিকস মঞ্চে মোদি-জিনপিংয়ের এই সম্ভাব্য বৈঠক বিশ্বের দরবারে পরিষ্কার বার্তা দেবে যে, চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশের মধ্যেও দুই প্রতিবেশী দেশ শান্তি, কूटনীতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিকল্প রাস্তা খুঁজে নিতে তৎপর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *