জলবিদ্যুৎই ভাগ্য বদলে দিয়েছিল নেপালের! কিন্তু প্রকৃতির এক কোপেই কি শেষ সব স্বপ্ন?

একসময় পর্যটন এবং বিদেশি সাহায্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল নেপালের অর্থনীতি। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই ছবি বদলাতে শুরু করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের হাত ধরে। একসময়ের বিদ্যুৎহীন অন্ধকার দেশটিই কীভাবে ঘুরে দাঁড়াল এবং কেন হঠাৎ হিমালয়ের কোপে তাদের সমস্ত অর্জন আজ ধ্বংসের মুখে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর শঙ্কা।
২০১০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নেপালের মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছেছিল এবং সেসময়ও দিনে প্রায় ১৬ ঘণ্টা লোডশেডিং চলত। এই পরিস্থিতি বদলাতে বরফগলা নদীর জলকে কাজে লাগিয়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। যার জেরে ২০১৮ সালের মধ্যেই দেশের সিংহভাগ মানুষ ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পেতে শুরু করেন। নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশটিতে ২২৫টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে, যার মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৩,৯০০ মেগাওয়াটের বেশি। এই কেন্দ্রগুলির হাত ধরেই প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের ঘরে আলো জ্বলছে।
এখানেই থেমে থাকেনি কাঠমান্ডু। বর্তমানে নেপালে ২১০টিরও বেশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে। শিল্পমহলের ধারণা, এই প্রকল্পগুলি সম্পন্ন হলে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু জলবিদ্যুৎকে কেন্দ্র করে এই বিপুল আর্থিক বিনিয়োগ ও সাফল্যের ঠিক মুখেই দেখা দিয়েছে এক ভয়ংকর প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জ।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, বিশ্ব গড় তাপমাত্রার তুলনায় হিমালয়ের উচ্চ পাহাড়ি অঞ্চলের তাপমাত্রা প্রায় ৫০ শতাংশ দ্রুতগতিতে বাড়ছে। এর জেরে হিমবাহ গলতে শুরু করায় পাহাড়ি নদী ও উপত্যকায় গড়ে ওঠা কোটি কোটি টাকার পরিকাঠামো চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি হিমবাহ ধসে নীচের পাথুরে জমি ভেঙে যাওয়ার ফলেই বিধ্বংসী হড়পা বান নেমেছিল। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নেপালে ঘটা বড় দুর্যোগগুলির ৯০ শতাংশের বেশিই জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
সবমিলিয়ে নেপালের সামনে এখন এক কঠিন দ্বিমুখী লড়াই। একদিকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান হাতিয়ার এই জলবিদ্যুৎ খাতকে টিকিয়ে রাখতে হবে, অন্যদিকে হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে পরিকাঠামো রক্ষা করতে নিতে হবে সুদূরপ্রসারী ও কঠোর পদক্ষেপ। ২৬ আগস্টের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ই এখন দেশটির নীতিনির্ধারকদের কপালে বড় চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।