নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান! নিখোঁজ পাঁচ হাজারের বেশি, দিন-রাত উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে সেনা

সামনে শুধু কাদা, পাথর আর ধ্বংসস্তূপ। কোথাও নদীর বুকজুড়ে বিশাল বোল্ডার, আবার কোথাও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভিতর কয়েকশো মিটার এগিয়ে তল্লাশি চালাতে হচ্ছে। এর মধ্যেই সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিখোঁজ মানুষদের সন্ধান চালাচ্ছে নেপাল সেনা। ভয়াবহ হড়পা বাণের দুই সপ্তাহ পরেও নিখোঁজ রয়েছেন ৫ হাজার ১৩২ জন এবং মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই পৌঁছেছে ১ হাজার ৩৬৯ জনে। তাঁদের মধ্যে ঠিক কত জন এখনও সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে রয়েছেন আর কত জন নদীর প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়েছেন, তার সঠিক উত্তর খুঁজতেই দিন-রাত এক করে উদ্ধার অভিযান চলছে।

গত ২৬ অগস্ট নেপালের তিব্বত সীমান্তের কাছে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটার পর থেকেই উদ্ধারকাজে নেমে পড়ে নেপাল সেনা। গত দুই সপ্তাহে প্রায় ৯ হাজার ৩০০ সেনাকে বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে। হেলিকপ্টারে দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করা থেকে শুরু করে নদীর তীর, ধ্বংসস্তূপ এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে তল্লাশি—সব কাজই একসঙ্গে চালানো হচ্ছে।

নেপাল সেনার ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজা রাম বাসনেট জানিয়েছেন, তাঁদের একটাই মূল লক্ষ্য—যত বেশি সম্ভব মানুষকে জীবত বা মৃত উদ্ধার করা। তাঁর কথায়, “আমাদের কাছে সব সময় ‘মিশন ফার্স্ট’।”

এক দিনে বদলে গেল নদী
নেপালের সীমান্তবর্তী এলাকায় হিমবাহ ধসের ফলেই এই বিপর্যয় ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে জল, কাদা এবং পাথরের প্রবল স্রোত নেমে আসে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী দিয়ে। স্থানীয়দের দাবি, সেই স্রোতের গতি ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ থেকে ১৯০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছেছিল। ফলে নদীর আশপাশের মানুষজনকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার কার্যত কোনো সুযোগই দেয়নি প্রকৃতি।

সেনার পাইলটদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কিছু কিছু জায়গায় জলের উচ্চতা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২০০ মিটার পর্যন্ত বেশি হয়ে গিয়েছিল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সঙ্গে সঙ্গে নামে সেনার ‘কম্পোজিট কুইক রিঅ্যাকশন টিম’ (CQRT)। Mi-17 হেলিকপ্টারে চিকিৎসক ও শল্যচিকিৎসকদের নিয়ে গিয়ে ত্রিশূলীতে একটি অস্থায়ী চিকিৎসা পরিকাঠামোও গড়ে তোলা হয়।

চিলিমে মরিয়া লড়াই
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে। সেখানে ছয়জন আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাঁদের কাছে পৌঁছতে নেপাল ও ভারতের যৌথ ২০ জন সেনা ও উদ্ধারকর্মী পাইপ ব্যবহার করে বিকল্প পথ তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় সেখানে ভারী যন্ত্রপাতি বা উদ্ধার সরঞ্জাম পাঠানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

আবহাওয়া ও প্রতিকূল পরিবেশ
উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রকৃতি। কখনও রোদ তো কখনও বৃষ্টি—দিনের মধ্যে একাধিক বার আবহাওয়া বদলাচ্ছে। নদীর তলদেশে জমে রয়েছে পুরু কাদার স্তর এবং বিশাল বোল্ডার। সুড়ঙ্গের ভিতরেও জল, কাদা ও পাথরের স্তূপ সরিয়ে উদ্ধারকারীদের প্রতি মিটার এগোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগছে।

পাশে ভারত, চিন ও দক্ষিণ কোরিয়া
এই কঠিন পরিস্থিতিতে নেপাল একা লড়ছে না। প্রতিবেশী ভারত ও চিনের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়াও তাদের উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় লাংটাং ও অন্যান্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্পেও সমান তালে তল্লাশি চলছে।

বিপর্যয়ের চোদ্দো দিন পেরিয়ে গেলেও নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, নেপাল সেনা সহজে হাল ছাড়তে নারাজ। সরকারের পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত এই উদ্ধার অভিযান অবিরাম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে নেপাল সেনা।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *