ওটি-তে ঢুকেই কেন সবুজ বা নীল পোশাক পরেন ডাক্তাররা? আসল কারণ জানলে চমকে যাবেন!

অপারেশন থিয়েটারের দরজা পেরোলেই চিকিৎসক ও নার্সদের গায়ে দেখা যায় নীল কিংবা সবুজ রঙের পোশাক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই পোশাকের নাম ‘স্ক্রাবস’। অনেকের মনেই এই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, চিকিৎসকদের প্রতীক হিসেবে পরিচিত সাদা অ্যাপ্রন বা অন্য কোনো রঙের পোশাকের পরিবর্তে অস্ত্রোপচারের সময় কেন মূলত এই দুটি রঙই বেছে নেওয়া হয়? এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসা বিজ্ঞান ও চোখের কর্মক্ষমতার বৈজ্ঞানিক হিসাব।

একসময় অবশ্য অপারেশন থিয়েটারে চিকিৎসকদের পরনেও সাদা রঙের পোশাকই থাকত। পরিচ্ছন্নতা এবং জীবাণুমুক্ত পরিবেশের প্রতীক হিসেবেই সেই সময় সাদা পোশাকের চল ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে অস্ত্রোপচার চলাকালীন এই সাদা পোশাক চিকিৎসকদের কাজের ক্ষেত্রে নানা সমস্যার সৃষ্টি করত।

অপারেশনের সময় সার্জনদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকতে হয় রক্তের লালচে অংশ এবং মানবদেহের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দিকে। দীর্ঘক্ষণ রক্তের লাল রঙের দিকে একটানা তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ যদি চোখ সাদা পোশাক বা অপারেশন থিয়েটারের সাদা দেওয়ালের দিকে যায়, তবে চোখে তীব্র অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। অতিরিক্ত উজ্জ্বলতার কারণে দৃষ্টিতে সাময়িক বিভ্রম বা ধাঁধাও দেখা দিতে পারে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমন পরিস্থিতিতে কাজ করলে চিকিৎসকদের চোখে অতিরিক্ত চাপ ও ক্লান্তি সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক।

এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবেই ধীরে ধীরে অপারেশন থিয়েটারে নীল ও সবুজ রঙের পোশাকের প্রচলন বাড়ে। দৃশ্যমান আলোর বর্ণালিতে নীল ও সবুজ রং ঠিক লাল রঙের বিপরীত দিকে অবস্থান করে। ফলে রক্তের লাল রঙের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর চিকিৎসকের দৃষ্টি যখন এই নীল বা সবুজ কাপড়ের ওপর পড়ে, তখন চোখের ওপর চাপ অনেক কমে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটানা লাল রঙের দিকে তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ সাদা রঙের দিকে তাকালে চোখে সাময়িকভাবে সবুজ রঙের বিভ্রম তৈরি হতে পারে। অস্ত্রোপচারের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সূক্ষ্ম কাজে চোখের এই ‘ভিজ্যুয়াল ইলিউশন’ চিকিৎসকদের মনোযোগে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে পারে। নীল বা সবুজ রঙের পোশাক এই সমস্যার হাত থেকে চোখকে রক্ষা করে। পাশাপাশি, রক্তের লাল রঙের বিভিন্ন সূক্ষ্ম শেড বা পার্থক্য স্পষ্টভাবে শনাক্ত করতেও চিকিৎসকদের দারুণভাবে সাহায্য করে এই রঙ।

অর্থাৎ, চিকিৎসকদের এই নীল বা সবুজ পোশাক নিছক কোনো করপোরেট ড্রেসকোড বা হাসপাতালের প্রচলিত নিয়ম নয়। অস্ত্রোপচারের সময় চোখকে আরাম দেওয়া, দৃষ্টির বিভ্রম রোধ করা এবং নিখুঁতভাবে কাজ করার সুবিধা নিশ্চিত করতেই এই রঙ বেছে নেওয়া হয়েছে।

এই বিশেষ পোশাকের নাম ‘স্ক্রাবস’ হওয়ার পেছনেও রয়েছে একটি ইতিহাস। অস্ত্রোপচারকক্ষে ঢোকার আগে চিকিৎসকরা হাত ও কনুই পর্যন্ত নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে জীবাণুমুক্ত বা পরিষ্কার করেন। এই পরিচ্ছন্নতার প্রক্রিয়াটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘স্ক্রাবিং ইন’। এই প্রক্রিয়ার নাম থেকেই পোশাকটির নাম হয়ে গেছে ‘স্ক্রাবস’।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, চিকিৎসাবিজ্ঞানে জীবাণু প্রতিরোধের ধারণা যখন আরও পোক্ত হতে শুরু করে, তখন থেকেই অপারেশন থিয়েটারের পোশাক, গ্লাভস, মাস্ক এবং জীবাণুমুক্ত সরঞ্জামের ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ১৯১৮ সালের ভয়াবহ ফ্লু মহামারির পর চিকিৎসা ক্ষেত্রে জীবাণু সংক্রমণ রোধের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে আধুনিক জীবাণুমুক্ত অস্ত্রোপচার পদ্ধতি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হলে স্ক্রাবস অপারেশন থিয়েটারের একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে। তাই ওটি-র এই নীল-সবুজ পোশাক কেবল সাজসজ্জা নয়, এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে চিকিৎসকের দৃষ্টিশক্তি, মনোযোগ এবং রোগীর জীবনের সুরক্ষার বিজ্ঞান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *