গ্রামে কানেকশন থাকলেও কেন গ্যাস জ্বলছে না? CEEW-এর চাঞ্চল্যকর সমীক্ষায় উঠে এল আসল সত্যি!

কাগজে-কলমে এলপিজি (LPG) কানেকশন থাকলেও দেশের একটা বড় অংশের মানুষের হেঁশেলে গ্যাস পৌঁছাচ্ছে না। কাউন্সিল অন এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটার (CEEW)-এর সাম্প্রতিক তিনটি সমীক্ষায় এই উদ্বেগজনক চিত্রটি প্রকাশ্যে এসেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, গ্রামের দিকে গ্যাস সংযোগ থাকলেও তার ব্যবহার আশানুরূপ নয়। এর প্রধান কারণ হিসেবে চড়া দাম এবং বাড়ি পর্যন্ত সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়ার পরিকাঠামোর অভাবকে দায়ী করা হয়েছে।

গ্রাম ও শহরের দুই ছবি

সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, গ্রামের মাত্র ৪৭ শতাংশ এলপিজি ব্যবহারকারী বাড়িতে সরাসরি সিলিন্ডার ডেলিভারি পান। যদিও ৭৩ শতাংশ পরিবার গত ৯০ দিনে গ্যাস ব্যবহার করেছে, তাদের মধ্যে মাত্র ২৩ শতাংশ পুরোপুরি গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। গ্রামের প্রায় অর্ধেক পরিবার রান্নার জন্য আজও মূলত কাঠের জ্বালানির উপরই ভরসা করে। সঠিক তথ্য এবং দুর্বল ডেলিভারি নেটওয়ার্কের জেরে তৈরি হওয়া এই ফাঁকের সুযোগ নিচ্ছে চোরাবাজার। স্থানীয় দোকান বা বেআইনি ডিলারদের কাছ থেকে চড়া দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

অন্যদিকে, শহরাঞ্চলে পরিস্থিতির ভিন্ন রূপ দেখা গেছে। শহরের গরিব এলাকাগুলিতে ৭০ শতাংশ মানুষ গ্যাস ব্যবহার করলেও, ৩১ শতাংশেরই কোনো বৈধ কানেকশন নেই। ঠিকানার প্রমাণপত্র না থাকায় তাদের আবেদন বাতিল হওয়ায় ১১ শতাংশ মানুষ ৮০৩ টাকার সিলিন্ডার ১০৪০ টাকা দিয়ে ব্ল্যাক মার্কেট থেকে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

পরিযায়ী শ্রমিকদের চরম দুর্দশা

সবচেয়ে খারাপ অবস্থার মধ্যে রয়েছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। সমীক্ষা বলছে, ৭৯ শতাংশ পরিযায়ী শ্রমিকের কাছেই কোনো বৈধ এলপিজি কানেকশন নেই। ২০২১ সালে নিয়ম সহজ করা সত্ত্বেও, প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা (PMUY)-র আওতায় নাম লিখিয়েছেন মাত্র ৪ শতাংশেরও কম মানুষ। খোলা জায়গায় থাকা পরিযায়ী শ্রমিকদের ৭০ শতাংশই রান্নার জন্য সম্পূর্ণভাবে কাঠ বা কয়লার মতো দূষণকারী জ্বালানির উপর নির্ভরশীল। যাঁরা চোরাবাজার থেকে গ্যাস কেনেন, তাঁদের প্রতি কেজিতে ৭১ টাকা দিতে হয়, যা সাধারণ দামের তুলনায় ২০ শতাংশেরও বেশি।

মূল বাধা সিলিন্ডারের দাম

CEEW-এর মতে, শুধু কানেকশন দিলেই দূষণমুক্ত পরিবেশের লক্ষ্য পূরণ হবে না। পরিবারগুলো নিয়মিত রিফিল করাতে না পারলে, পরিযায়ী শ্রমিকরা সচেতন না হলে বা গ্রামে সিলিন্ডার না পৌঁছালে দূষণ ছড়ানো জ্বালানির ব্যবহার কমবে না। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৮০ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, ১৪.২ কেজির সিলিন্ডারের দাম যদি ৪০০ টাকা হয়, তবেই তাঁরা পুরোপুরি এলপিজি ব্যবহার শুরু করবেন। বেশিরভাগ মানুষ সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে রাজি, যা বর্তমানে পিএমইউওয়াই (PMUY)-এর ভর্তুকিযুক্ত দামের চেয়ে অনেকটাই কম।

সমস্যা সমাধানে একগুচ্ছ প্রস্তাব

পরিস্থিতি বদলাতে সংযোগ বাড়ানোর পরিবর্তে নিয়মিত ব্যবহারের দিকে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে CEEW। গ্রামের মানুষের জন্য রিফিলের দাম কমানো, ডোরস্টেপ ডেলিভারি নিশ্চিত করা, শহরের গরিবদের জন্য কাগজপত্রের নিয়ম সহজ করা এবং মাইক্রো-পেমেন্টের ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি, পেট্রোলিয়াম ও মন্ত্রককে পিএমইউওয়াই সিলিন্ডারে ভর্তুকি প্রায় ২০০ টাকা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের নাম নথিভুক্ত করতে বিশেষ অভিযান এবং গ্রামে ডিস্ট্রিবিউটরদের জন্য আলাদা কমিশন চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *