ব্যাঙ্কিং সিস্টেমে হঠাৎ টাকার বান! মুদ্রাস্ফীতি ঠেকাতে এবার বড় পদক্ষেপ নিল আরবিআই

ভারতীয় ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় হঠাৎ করেই উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ অনেকটাই বেড়ে গেছে। ফরেন কারেন্সি নন-রেসিডেন্ট ব্যাঙ্ক বা এফসিএনআর(বি) (FCNR(B)) আমানতের ব্যাপক বৃদ্ধি এবং বিদেশি মূলধন প্রবাহের জেরে দেশের বাজারে নগদ অর্থের এই বিপুল প্রাচুর্য দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাঙ্কিং সিস্টেমে এই অতিরিক্ত তারল্যের কারণে স্বল্পমেয়াদী মানি মার্কেটের হার রেপো রেটের নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার (RBI) মূল লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং মানি মার্কেটের সুদের হারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবার সক্রিয়ভাবে ভ্যারিয়েবল রেট রিভার্স রেপো (VRRR) নিলামের পথ বেছে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক।

ভিআরআরআর (VRRR) নিলাম আসলে কী?

ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত তারল্য বা নগদ অর্থ তুলে নেওয়ার জন্য রিজার্ভ ব্যাঙ্কের এটি একটি অত্যন্ত কার্যকরী স্বল্পমেয়াদী হাতিয়ার। এই প্রক্রিয়ার অধীনে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলি একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার (যেমন ৩, ৭ বা ১৪ দিন) জন্য তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ আরবিআই-এর কাছে জমা রাখে এবং তার বিপরীতে প্রতিযোগিতামূলক বা পরিবর্তনশীল হারে সুদ অর্জন করে।

অনাবাসী ভারতীয়দের (NRI) এফসিএনআর(বি) অ্যাকাউন্টগুলিতে বৈদেশিক মুদ্রা জমা হওয়া এবং কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের ডলার কেনার ফলে ব্যাঙ্কিং সিস্টেমে দেশীয় মুদ্রার জোগান হু হু করে বেড়ে গিয়েছে। সময়মতো এই অতিরিক্ত তারল্য নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আর্থিক বাজারে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্যাঙ্কগুলি ইতিমধ্যেই আরবিআই-এর এই বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে ১২৭ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে।

সুদের হারের পতন ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ

ব্যাঙ্কগুলির হাতে অতিরিক্ত নগদ থাকলে তারা আন্তঃব্যাংকিং বাজারে অত্যন্ত কম সুদে ঋণ দিতে শুরু করে। ভিআরআরআর নিলামের মাধ্যমে এই অতিরিক্ত অর্থ তুলে নিয়ে আরবিআই নিশ্চিত করে যে, ওভারনাইট কল মানি রেট এবং ট্রেপস (Triparty Repo) রেটের মতো হারগুলি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের বেঞ্চমার্ক পলিসি রেট অর্থাৎ রেপো রেটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।

দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে অতিরিক্ত তারল্য বজায় থাকলে তা সাধারণ মানুষের চাহিদাজনিত মুদ্রাস্ফীতিকে বাড়িয়ে দিতে পারে। ভিআরআরআর নিলামের মাধ্যমে একদিকে যেমন মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি ঠেকানো হয়, তেমনই বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলিকেও তাদের অলস তহবিলের ওপর একটি নিরাপদ ও নিয়মতান্ত্রিক মুনাফা অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া হয়। চলতি বছরের ২৮শে আগস্ট পর্যন্ত শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রেকর্ড ৭৪০.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একদিকে যেমন ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জেরে রুপির ওপর চাপ রয়েছে, তেমনই চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে (এপ্রিল-জুন) ভারতের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে শক্তিশালী ৭.৮ শতাংশে।

তারল্য শোষণের বিকল্প পথগুলি কী কী?

ভিআরআরআর ছাড়াও বাজার থেকে তারল্য নিয়ন্ত্রণের আরও বেশ কিছু কার্যকর উপায় রয়েছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। নোমুরার প্রধান অর্থনীতিবিদ সোনল ভার্মার মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ধারাবাহিক ভিআরআরআর কার্যক্রম ছাড়াও প্রয়োজন অনুযায়ী নগদ রিজার্ভ অনুপাত (CRR) ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করা কিংবা সেল-বাই সোয়াপের মতো পদ্ধতিও ব্যবহার করতে পারে। সেল-বাই সোয়াপের ক্ষেত্রে আরবিআই বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির কাছে বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রি করে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের পর তা আবার কিনে নেওয়ার চুক্তি করে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আসন্ন উৎসবের মরসুমে সাধারণ মানুষের মধ্যে নগদ অর্থের চাহিদা বৃদ্ধি এবং ফরোয়ার্ড চুক্তির মেয়াদপূর্তির জেরে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার এই উদ্বৃত্ত তারল্য কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আর্থিক বাজারে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি না করে প্রবৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখতে আরবিআই-কে এই ধরনের তারল্য শোষণ প্রক্রিয়া নিয়মিত চালিয়ে যেতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *