টেনিস কোর্ট নাকি সার্কাস! রিলস বানানোর হিড়িকে চরম বিরক্ত তারকারা, আসরে উইম্বলডন

টেনিসের রুদ্ধশ্বাস ব্যাকহ্যান্ড বা দুর্দান্ত ড্রপ শটের চেয়ে এখন গ্যালারির ফ্রন্ট-ক্যামেরাই যেন বেশি জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে! হাতে স্মার্টফোন, মুখে রিলস বানানোর আজব সংলাপ আর চোখে-মুখে সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক কুড়োনোর মরিয়া তাগিদ—ইউএস ওপেনের গ্যালারির বর্তমান ছবিটা ঠিক এমনই। কোর্টে কে ঘাম ঝরাচ্ছে, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই একদল দর্শকের। একমাত্র লক্ষ্য যেন কন্টেন্ট ক্রিয়েশন। দর্শকদের এই অদ্ভুত আচরণে টেনিসের বিশ্বসেরা তারকারা এখন চূড়ান্ত বিরক্ত। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, আগামী দিনে ইনফ্লুয়েন্সারদের জন্য অত্যন্ত কড়া নিয়ম আনতে চলেছে উইম্বলডন। ঘাসের কোর্টের রাজকীয় ঐতিহ্যে এই ‘টিকটক-তাণ্ডব’ বরদাস্ত করতে একেবারেই নারাজ আয়োজকরা।

ফ্ল্যাশিং মিডোজে রিলসের বাড়বাড়ন্ত
নতুন প্রজন্মের দর্শকদের টেনিসের দিকে টানতে এবার বেশ অভিনব এক উদ্যোগ নিয়েছিল ইউএস ওপেন কর্তৃপক্ষ। প্রথাগত সাংবাদিকদের পাশাপাশি প্রায় ১০০ জন সোশ্যাল মিডিয়া কন্টেন্ট ক্রিয়েটরকে টুর্নামেন্ট কভার করার বিশেষ অ্যাক্রেডিটেশন দেওয়া হয়। কিন্তু সেই সুযোগটাই এখন বুমেরাং হয়ে ফিরেছে। গ্যালারিতে বসা এই ইনফ্লুয়েন্সারদের কান্ডকারখানায় রীতিমতো নাজেহাল হচ্ছেন প্রফেশনাল খেলোয়াড়রা। পয়েন্ট চলাকালীন উচ্চস্বরে কথা বলা থেকে শুরু করে রিং লাইট জ্বেলে ভিডিও বানানো—বাদ যাচ্ছে না কিছুই।

ব্রিটিশ সংবাদসংস্থার খবর অনুযায়ী, এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে উইম্বলডন কিন্তু আগেভাগেই সতর্ক হয়ে গিয়েছে। অল ইংল্যান্ড ক্লাব স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ইনফ্লুয়েন্সারদের জন্য ভবিষ্যতে তারা আর কোনো আলাদা বা বিশেষ অ্যাক্রেডিটেশন ক্যাটেগরি রাখবে না। শুধু তাই নয়, রিং লাইট বা ম্যাচের মাঝে বিঘ্ন ঘটায় এমন যে কোনো আধুনিক সরঞ্জামের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।

তারকাদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ
মহিলা টেনিসের অন্যতম বড় মুখ কোকো গফ নতুন দর্শকদের এই উদ্ধত আচরণে ভীষণভাবে তিতিবিরক্ত। যদিও ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত কোনো রাগ বা আক্রোশ নেই। পাউলা বাদোসাকে হারানোর পর নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে গফ বলেন, ‘‘খেলার মাঠে নতুন দর্শকদের আসাটা দারুণ ব্যাপার। ইনফ্লুয়েন্সারদের নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই, অনলাইনে আমি নিজেও কয়েকজনকে ফলো করি।’’

তাহলে আসল সমস্যাটা কোথায়? মার্কিন এই তারকার সোজা সাপটা বক্তব্য, ‘‘যে ভেন্যুতেই আসুন না কেন, সেখানকার নির্দিষ্ট শিষ্টাচার মানতে হবে। অন্তত ফ্ল্যাশ ফটোগ্রাফিটা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত, এতে আমাদের খেলায় মারাত্মক সমস্যা হয়। পয়েন্ট চলাকালীন টিকটক বানানো বা জোরে কথা বলাটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’’ দর্শকদের এই সমস্ত রীতিনীতি ও শালীনতা শেখানোর পুরো দায়টি মূলত স্পনসরদের ঘাড়েই চাপিয়েছেন তিনি।

শুধু কোকো গফ একা নন, ইউএস ওপেনের সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন ফরাসি তারকা আদ্রিয়ান মান্নারিনোও। তাঁর মতে, কোটের চারপাশটা এখন রীতিমতো সার্কাসে পরিণত হয়েছে। মান্নারিনোর ক্ষোভ ভরা সংযোজন, ‘‘পয়েন্ট চলাকালীন দর্শকরা দিব্যি এখানে-সেখানে চলাফেরা করছে। টুর্নামেন্ট কর্তৃপক্ষও এগুলো চুপচাপ মেনে নিচ্ছে। এটা টেনিসের খেলার জন্য আদৌ ভালো কি না জানি না। কোর্টের চারপাশে গাঁজার গন্ধ, সব জায়গায় শুধু হইচই আর আওয়াজ। সত্যি বলতে, জায়গাটা যেন একটা চিড়িয়াখানা হয়ে যাচ্ছে!’’

উইম্বলডনের ঐতিহ্য ও পরিবেশ অবশ্য চিরকালই সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে পিন পড়লেও নিখুঁত শব্দ শোনা যায়। দর্শকদের পোশাক থেকে শুরু করে স্টেডিয়ামের আচরণ—সব কিছুতেই বজায় থাকে এক রাজকীয় ছোঁয়া। অল ইংল্যান্ড ক্লাব প্রতি বছরই তাদের নিয়মকানুন অত্যন্ত কঠোরভাবে খতিয়ে দেখে। এমনিতেই তাদের নিয়মে যেকোনো বিঘ্নসৃষ্টিকারী জিনিস নিষিদ্ধ। এবার দর্শকদের হাতের স্মার্টফোনের দৌরাত্ম্য রুখতে সেই চেনা আভিজাত্যের মোড়কেই আরও কড়া দাওয়াই আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে গ্র্যান্ড স্লাম কর্তৃপক্ষ। আধুনিক ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতির সঙ্গে সাবেকি টেনিসের এই স্নায়ুর লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসে, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *