ঝুলনের খেলনা রেললাইনই আজ কাঁচরাপাড়ায় রেল ইঞ্জিনিয়ারদের পাঠশালা! তাক লাগালেন বাঙালি শিল্পী অনুপ

ছোটবেলায় ঝুলন সাজানোর শখ থাকে অনেকেরই। প্লাস্টিকের মানুষ, ছোট ছোট ঘরবাড়ি আর খেলনা রেললাইন দিয়ে সেই ঝুলন বানাতে বানাতেই যে এত বড় এক স্বপ্নের জন্ম হবে, তা হয়তো কখনও ভাবেননি নিউ ব্যারাকপুরের ৪৪ নম্বর আগাপুরের বাসিন্দা অনুপ বিশ্বাস। শুধু স্বপ্ন দেখাই নয়, অক্লান্ত পরিশ্রমে সেই স্বপ্নকেই বাস্তব রূপ দিয়েছেন তিনি। তাঁর সুনিপুণ হাতে তৈরি হয়েছে আস্ত একটি রেলওয়ে মিনিয়েচার মডেল।
মাত্র ২৪ ফুটের একটি বোর্ডের ওপর তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি কাল্পনিক রেলপথ। অনুপের এই অসামান্য প্রতিভাকে এবার পাকাপাকিভাবে স্বীকৃতি দিল ভারতীয় রেল। তাঁর নিজের হাতে তৈরি এই মডেলটি এখন কাঁচরাপাড়া রেলওয়ে মিউজিয়াম এবং ওয়ার্কশপে জায়গা করে নিয়েছে। শুধু প্রদর্শনের জন্য নয়, এই নিখুঁত মডেলটি এবার ব্যবহার করা হবে রেলের ইঞ্জিনিয়ারদের প্রশিক্ষণের কাজেও।
শিল্পের রক্তে গড়া নিখুঁত সৃষ্টি
অনুপ আর্ট কলেজের প্রাক্তন ছাত্র। শিল্পকর্ম যেন তাঁর রক্তে মিশে আছে। এর আগেও তিনি এনটিপিসি বা সোলার পাওয়ার প্ল্যান্টের মতো বড় প্রজেক্টের মিনিয়েচার তৈরির কাজ সফলভাবে করেছেন। তবে রেলের এই কাজটি তাঁর কাছে সম্পূর্ণ এক নতুন এবং রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। মধ্যমগ্রামের এক বন্ধুর হাত ধরে এই কাজের বরাত তাঁর কাছে আসে। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে তৈরি এই মডেলটি তিনি নিজেই গিয়ে কাঁচরাপাড়ায় ইনস্টল করে এসেছেন। নিজের এই কাজ নিয়ে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “খুব সুন্দর ভাবে আমি দেখছি, আমি গর্বিত এবং আমার কাছে এটা মনে হয়েছে সত্যি আমি কিছু করলাম।”
কী নেই এই ২৪ ফুটের মডেলে!
একটি ৪৫ কিলোমিটারের রেলপথে যা যা থাকে, তার সবই নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে এই মিনিয়েচারে। প্ল্যাটফর্ম, ওভারব্রিজ, লেভেল ক্রসিং, সিগন্যালিং সিস্টেম, টিকিট কাউন্টার থেকে শুরু করে ইলেকট্রিক সাপ্লাইয়ের খুঁটিনাটি—সবটাই রয়েছে। রেললাইনে ৩৩ হাজার ভোল্টেজ কীভাবে ডাউন হয়ে আসে, তারের বিন্যাস, নিউট্রাল জোন, পোর্সেলিনের ইনসুলেটর, এমনকি ট্রেনের যাতায়াতের সুড়ঙ্গ বা টানেল, সবই অবিকল তৈরি করা হয়েছে।
এই কাজের জটিলতা বোঝাতে গিয়ে অনুপ বিশ্বাস জানান, “এইটাকে বলে মিনিয়েচার। ৪৫ কিলোমিটার রাস্তাটাকে ওই ছোট্ট জায়গার মধ্যে এনে দেখানো হয়েছে।” স্কেলিংয়ের বিষয়ে তিনি জানান, ১:১০০ স্কেলের মাপে এটি তৈরি করা হয়েছে। বাস্তবের সঙ্গে যাতে কোনও ফারাক না-থাকে, সেদিকে কড়া নজর ছিল শিল্পীর। সাধারণ পাথর বা বড় জিনিস দিয়ে দায়সারা কাজ না করে, ছাঁকনি দিয়ে চেলে নির্দিষ্ট মাপের পাথর, থ্রিডি প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও তামার তার ব্যবহার করা হয়েছে। রেললাইনের পাথর তিন ধাপে লেয়ারিং করে বসানো হয়েছে।
অদম্য জেদ ও পরিশ্রম
কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও দিনরাত এক করে কাজ করতে হয়েছে অনুপকে। স্ত্রী সকালে ও দুপুরে খাবার দিয়ে যেতেন। সকাল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত একটানা কাজ করেছেন তিনি। প্রথমে ২২ দিন সময় দেওয়া হলেও, নিখুঁত ফিনিশিংয়ের জন্য প্রায় ৬০-৬৫ দিন সময় লেগে যায়। তবে তিনি একা নন, ডিজাইনার সুচন সাঁতরা সহ ৩-৪ জন মিলে রাতদিন পরিশ্রম করে এই কাজ সম্পন্ন করেছেন।
স্বীকৃতি ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
কাঁচরাপাড়ায় এখন যাঁরা রেলের চাকরির জন্য পড়াশোনা করছেন বা কোয়ার্টারে থাকছেন, এই মডেলটি তাঁদের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে দারুণ সাহায্য করবে। থিওরির পাশাপাশি তাঁরা চোখের সামনে দেখতে পাবেন কীভাবে সিগন্যাল কাজ করে, তারের সংযোগ কীভাবে হয় বা লাইন কীভাবে বদলায়। ঝুলনের সেই ছোট্ট রেললাইন আজ বাস্তবের ইঞ্জিনিয়ারদের পথ দেখাচ্ছে। নিউ ব্যারাকপুরের অনুপ বিশ্বাসের এই সৃষ্টি এখন শুধু তাঁর একার নয়, গোটা রাজ্যের এক অনন্য গর্ব।