২২,০০০ কোটি টাকার ঋণ মাত্র ৬.২৫ কোটিতে শেষ! সুভাষ চন্দ্রের দেউলিয়া কাণ্ডের নেপথ্যে কোন ভয়ানক জালিয়াতি?

এসেল (Essel) গ্রুপ এবং জি (Zee)-র প্রধান সুভাষ চন্দ্রের বিরুদ্ধে চলা ঋণ সংক্রান্ত আইনি লড়াই বর্তমানে দেশের ব্যাঙ্কিং মহলে চরম চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। ন্যাশনাল কোম্পানি ল ট্রাইব্যুনাল (NCLT)-এর সাম্প্রতিক একটি রায়ে ২২,০০০ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের ঋণ মাত্র ৬.২৫ কোটি টাকার বিনিময়ে নিষ্পত্তির অনুমতি দেওয়া নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বিশাল এই ঋণ মওকুফের নেপথ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত গ্যারান্টি, ভোটাধিকারের গোপন কারসাজি এবং আইনগত মারপ্যাঁচের এক চাঞ্চল্যকর ইতিহাস।

যেভাবে শুরু হয়েছিল এই আর্থিক বিবাদ

এই জটিল কাহিনির সূত্রপাত হয় ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। ইন্ডিয়াবুলস হাউজিং ফাইন্যান্স থেকে সুভাষ চন্দ্রের গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত বিবেক ইনফ্রাকন ১৭০ কোটি টাকার ঋণ নেয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা আরও ঋণ নেওয়ায় মোট বকেয়া বেড়ে দাঁড়ায় ৭২৬ কোটি টাকায়। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে এই ঋণের বিপরীতে ব্যক্তিগত গ্যারান্টি দেন স্বয়ং সুভাষ চন্দ্র। নিয়ম অনুযায়ী, ঋণ পরিশোধে সংস্থাগুলি ব্যর্থ হলে সেই অর্থ মেটানোর কথা ছিল তাঁর।

সুভাষ চন্দ্রের পরিকল্পনা ও ব্যাঙ্কগুলির আপত্তি

পাহাড়প্রমাণ দেনা মেটাতে আদালতে যে পরিকল্পনা পেশ করেন সুভাষ চন্দ্র, তাতেই শুরু হয় যত বিপত্তি। তাঁর প্রস্তাব ছিল:

  • ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে পাওনাদারদের মাত্র ৬.২৫ কোটি টাকা পরিশোধ করা হবে।

  • এর সঙ্গে আদালত ও দেউলিয়া প্রক্রিয়া বাবদ দেওয়া হবে অতিরিক্ত ২৫ লক্ষ টাকা

  • অন্যদিকে ঋণগ্রহীতা সংস্থাগুলি নিজেদের দায়িত্বে আরও প্রায় ১,৪৯৪ কোটি টাকা আলাদাভাবে শোধ করবে।

ব্যাঙ্কগুলির মূল আপত্তি ছিল, যেখানে তাদের পাওনা ছিল প্রায় ২২,০০৬ কোটি টাকা, সেখানে মাত্র ৬.২৫ কোটি টাকা (যা মোট অঙ্কের মাত্র ০.০২ শতাংশ) দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। একে ব্যবসায়িক ভাষায় ‘ম্যাসিভ হেয়ারকাট’ বা বিশাল লোকসান বলে অভিহিত করা হচ্ছে। এছাড়া ভোটাধিকারের ক্ষেত্রেও কারসাজির অভিযোগ তুলেছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাঙ্কগুলি। বিরোধীদের অভিযোগ, এই পরিকল্পনার পক্ষে যে বিপুল ভোট পড়েছিল, তার বড় অংশই ছিল সুভাষ চন্দ্রের নিজস্ব বা অধিভুক্ত সংস্থার।

আদালতের রায় ও বর্তমান পরিস্থিতি

এই মামলায় প্রথমে এনসিএলটির বিচারকদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। একজন বিচারক পরিকল্পনাটি খারিজ করলেও অন্যজন তা অনুমোদন করেন। পরবর্তী সময়ে তৃতীয় এক বিচারক এই পরিকল্পনা অনুমোদন করলে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে এনসিএলটির জ্যেষ্ঠতম চেয়ারপার্সন ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করেন এবং এই নির্দেশ স্থগিত করার জন্য পাঁচজন বিচারপতির একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেন। বর্তমানে বৃহত্তর বেঞ্চে মামলাটির পুনর্বিবেচনা চলছে এবং আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে এর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। বিশাল এই আর্থিক বিবাদের জল কতদূর গড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *