ওড়িশার বুকেই লুকিয়ে ‘মিনি থাইল্যান্ড’! কম খরচে উইকেন্ডে ঘুরে আসার সেরা ঠিকানার হদিস

বর্ষাকাল মানেই প্রকৃতি যেন এক নতুন রূপ ধারণ করে সেজে ওঠে। আর এই বৃষ্টির দিনে যদি এমন কোনো অজান্তে হারিয়ে যাওয়া জায়গায় ঘুরে আসা যায় যেখানে পাহাড়, ঘন জঙ্গল আর স্বচ্ছ জলের ধারা একসঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, তাহলে ভ্রমণপিপাসুদের মনে প্রশান্তি আসাই স্বাভাবিক। ওড়িশার বড়েগড় শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে, বিখ্যাত ডিব্রুগড় অভয়ারণ্যের একেবারে গা ঘেঁষে কুসমুদা গ্রামে লুকিয়ে থাকা এমনই একটি জাদুকরি অফবিট ডেস্টিনেশন হলো ‘রানিচুয়ান’। শহরের কৃত্রিম কোলাহল এবং যান্ত্রিক ব্যস্ততা থেকে বহু দূরে, এই জায়গার চারপাশ জুড়ে রয়েছে শুধু শাল ও সেগুনের ঘন জঙ্গল এবং নাম না জানা হাজারো পাখির কলকাকলি।

কেন এই জায়গাকে বলা হয় ‘মিনি থাইল্যান্ড’?

এই অদ্ভুত সুন্দর জায়গাটির আসল আকর্ষণ হলো এর জাদুকরী জলের রঙ ও অনন্য ভূ-প্রকৃতি। উঁচু পাহাড়ের পাথুরে খাঁজ বেয়ে নেমে এসেছে এক আশ্চর্য সুন্দর নীল-সবুজ স্বচ্ছ জলধারা। পাথুরে মালভূমির ওপর দিয়ে বয়ে চলা এই জলধারা সরাসরি এসে পড়ছে ছোট ছোট প্রাকৃতিক পুলে। জলের স্বচ্ছতা এতটাই বেশি যে তার তলদেশের পাথর পর্যন্ত অনায়াসেই স্পষ্ট দেখা যায়। চারপাশে ঘেরা সবুজ উপত্যকা আর এই চোখ জুড়ানো ফিরোজা রঙের জলের অপূর্ব কম্বিনেশন দেখলে যে কারও মনে থাইল্যান্ডের বিখ্যাত ক্রাবি বা ফি ফি আইল্যান্ডের কথা মনে পড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। আর সেই কারণেই দেশের ভ্রমণপিপাসুরা ভালোবেসে এই জায়গার নাম দিয়েছেন ‘ওড়িশার থাইল্যান্ড’।

রানিচুয়ানে গিয়ে কী কী করবেন?

১. ফটোগ্রাফি ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন: চমৎকার ছবি তোলা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য আকর্ষণীয় কনটেন্ট বানানোর এটি একটি আদর্শ জায়গা। বিশেষ করে বর্ষার সময়ে জলের স্রোত যখন বৃদ্ধি পায়, তখন ড্রোন শটে এই জায়গার দৃশ্য দেখতে এককথায় অসাধারণ লাগে। ইনস্টাগ্রাম রিল কিংবা ইউটিউব শর্টসের জন্য এটি এখন নতুন হটস্পট হয়ে উঠেছে।
২. ডিব্রুগড় অভয়ারণ্য সাফারি: রানিচুয়ান ভ্রমণের পাশাপাশি আপনি অনায়াসেই ঘুরে নিতে পারেন সংলগ্ন ডিব্রুগড় অভয়ারণ্য। এখানকার বনাঞ্চলে হরিণ, বাইসন, ময়ূর এবং নানান প্রজাতির সুন্দর পরিযায়ী পাখি দেখতে পাওয়ার দারুণ সুযোগ রয়েছে। এছাড়া এখান থেকে বিশ্বখ্যাত হীরাকুদ ড্যামের ব্যাকওয়াটারও অত্যন্ত কাছে অবস্থিত।
৩. পিকনিক ও ট্রেকিং: স্থানীয় ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে এটি একটি চমৎকার পিকনিক স্পট হিসেবেও পরিচিত। জঙ্গলের মাঝে পাথরের ওপর বসে পুরো দিন কাটিয়ে দেওয়া যায়। সামান্য একটু ট্রেকিং করে উপরের ভিউ পয়েন্টে পৌঁছাতে পারলে পুরো উপত্যকার একটি রোমাঞ্চকর ৩৬০ ডিগ্রি প্যানোরামিক ভিউ উপভোগ করা সম্ভব।

কীভাবে যাবেন এবং কখন যাওয়ার সেরা সময়?

রানিচুয়ান ভ্রমণের জন্য সবথেকে সেরা সময় হলো বর্ষাকাল থেকে শীতের শুরুর দিকটা, অর্থাৎ সোজা কথায় জুলাই থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত। এই সময় এখানকার প্রাকৃতিক ঝরনা ও জলধারাগুলি পূর্ণ যৌবনা থাকে। কলকাতা থেকে ট্রেনে করে প্রথমে সম্বলপুর বা বড়েগড় রোড স্টেশনে পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে সরাসরি কুসমুদা গ্রামে যাওয়া যায়। তবে বড়েগড় থেকে শেষ ৫-৬ কিলোমিটার রাস্তা কিছুটা কাঁচা হওয়ায় যাতায়াতের জন্য এসইউভি (SUV) গাড়ি হলে সবচেয়ে সুবিধা হয়। এরপর গ্রাম থেকে মাত্র ১০-১৫ মিনিট হেঁটে ঝরনার মূল পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব।

থাকা ও খাওয়ার জন্য বড়েগড় বা সম্বলপুর শহরে ১০০০ থেকে ২০00 টাকার মধ্যে বেশ কিছু ভালো মানের হোটেল পেয়ে যাবেন। এছাড়া আপনি চাইলে ডিব্রুগড়ের স্থানীয় ইকো-রিসোর্টগুলিতেও থাকতে পারেন, যেখানে থাকা ও খাওয়া বাবদ জনপ্রতি আনুমানিক ২৫০০ টাকার মতো খরচ পড়তে পারে। তবে ভ্রমণকালে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি; যেমন—এই জায়গাটি এখনও পুরোপুরি উন্নত নয় এবং বর্ষার সময়ে এখানকার পাথরগুলি অত্যন্ত পিচ্ছিল হয়ে থাকে। তাই ভ্রমণের সময় অবশ্যই ভালো মানের ট্রেকিং জুতো পরে যাবেন, একা একা গভীর জলে নামার ঝুঁকি নেবেন না এবং প্রয়োজনে স্থানীয় কোনো গাইডের সাহায্য অবশ্যই গ্রহণ করবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *