নেপালে মহাপ্রলয় ভূমিকম্পে নয়, হিমবাহ ফেটেই কি ঘটেছিল ভয়াবহ বিপর্যয়? জেনেনিন আসল সত্যি

বুধবার সকাল সাড়ে আটটার কিছু পরে তিব্বতের দিক থেকে নেমে আসা কাদামাটি মিশ্রিত এক ভয়াবহ জলস্রোত নিমেষে গ্রাস করেছে নেপালকে। প্রকৃতির এই নিষ্ঠুর তাণ্ডবের সামনে দাঁড়িয়ে গোটা বিশ্ব আজ স্তব্ধ। চোখের পলকে খেলনার মতো দুমড়েমুচড়ে ভেসে গেছে ব্রিজ, বাড়ি, গাড়ি, রাস্তা থেকে শুরু করে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। কিন্তু কী এমন ঘটেছিল যার জেরে এই আচমকা বিপর্যয়? প্রাথমিক ভাবে অনেকেই একে ভূমিকম্প বলে মনে করলেও, আমেরিকার ভূতাত্ত্বিক সংস্থা USGS সাফ জানিয়ে দিয়েছে—এটি কোনও টেকটোনিক ভূমিকম্পের জেরে হয়নি, বরং হিমবাহ ও পাথরের বিশাল ধসেই নেমে এসেছে এই প্রলয়ঙ্করী হড়পা বান।

প্রথমে খবর মিলেছিল যে নেপাল-চিন সীমান্তে ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে এবং তার জেরেই এই বিপর্যয় ঘটেছে। কিন্তু পরবর্তীতে উপগ্রহের ছবি ও তথ্য বিশ্লেষণ করে নিজেদের রিপোর্ট সংশোধন করে ‘ইউনাইটেড স্টেটস জিয়োলজিক্যাল সার্ভে’ (USGS)। তারা জানায়, সেদিন ভোরে কোনো প্রচলিত ভূমিকম্প ঘটেনি। বরং তিব্বত অঞ্চলে পাহাড়ের বরফ ও পাথরের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ে লেহেন্দে নদীতে আছড়ে পড়ে। সেখান থেকেই তৈরি হয় প্রকাণ্ড ‘ডেব্রিস ফ্লো’, যা পরে চিনের সীমান্ত পেরিয়ে নেপালের ভোটেকোশি নদীতে আছড়ে পড়ে।

আমেরিকার ‘প্ল্যানেট ল্যাবস’-এর উপগ্রহ চিত্রেও সেই ধ্বংসলীলার ছবি ধরা পড়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছিল, তাহলে ৫.২ মাত্রার কম্পন সঙ্কেত এল কোথা থেকে? বিজ্ঞানীদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলে বরফ ও পাথরের ওই বিপুল ধস এবং কাদামাটির স্রোত এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তা থেকে বিশাল পরিমাণ সিসমিক এনার্জি বা ভূকম্পন তৈরি হয়। যা পরবর্তী সময়ে ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছিল। অর্থাৎ, ভূমিকম্পের কারণে ধস নামেনি, বরং ধস নামার ফলেই ভূমিকম্পের মতো তীব্র কম্পন অনুভূত হয়েছিল।

১৭৫ জনের দেহ উদ্ধার, নিখোঁজ বহু ভারতীয়

এই ভয়াবহ হড়পা বানের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে নেপালের রাসুয়া, ধাদিং এবং নুয়াকোট জেলায়। নেপাল পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত অন্তত ১৭৫ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং নিখোঁজের সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি।

নেপালের পর্যটন মন্ত্রকের তথ্য বলছে, বিপর্যয়ের জেরে প্রায় ৪০৩ জন পর্যটকের কোনো খোঁজ মিলছিল না, যার মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি। নিখোঁজ বিদেশিদের এই দীর্ঘ তালিকায় অন্তত ১৪২ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ আফ্রিকা ও আমেরিকার নাগরিকরাও নিখোঁজ রয়েছেন। চিনের তিব্বত অংশেও এর প্রভাব পড়েছে, যেখানে গিরং এলাকায় তিনজনের মৃত্যু ও ২৬৫ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর মিলেছে।

বিপর্যস্ত উদ্ধারকাজ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা

হড়পা বানের তোড়ে সীমান্তবর্তী এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ পরিকাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। রাতের অন্ধকারে মোবাইলের আলো জ্বেলেই নিখোঁজদের নাম নথিভুক্ত করতে দেখা গেছে পুলিশকে। অন্যদিকে, নেপাল সেনার প্রশিক্ষণকেন্দ্রকে উদ্ধারকাজের ঘাঁটি বানিয়ে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা হচ্ছে। নিখোঁজ প্রিয়জনদের খোঁজে সেনাকেন্দ্রের বাইরে ভিড় জমিয়েছেন স্বজনহারা মানুষ। পাহাড়ি অঞ্চলের এই আকস্মিক বিপর্যয় আবারও জলবায়ু পরিবর্তন ও হিমবাহের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *