লোকসান কাটিয়ে ফুলেফেঁপে উঠছে সরকারি ব্যাংকগুলি! বিশ্বমানের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হতে এবার কি বড়সড় পদক্ষেপ কেন্দ্রের?

এক দশক আগেও দেশের সরকারি খাতের ব্যাংকগুলি (PSB) বিপুল পরিমাণ ঋণ এবং লোকসানের বোঝায় জর্জরিত ছিল। কিন্তু সেই দিন আর নেই। বর্তমান সময়ে ব্যালেন্স শিটের লাগাতার উন্নতি, খেলাপি ঋণ বা এনপিএ (NPA)-র পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়া এবং দুর্দান্ত মুনাফার সুবাদে এই মুহূর্তে অত্যন্ত শক্ত জমির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলি। এই ইতিবাচক পরিস্থিতির মাঝেই একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও দূরদর্শী প্রস্তাব সামনে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদ (EAC-PM)-এর একটি নতুন প্রতিবেদনে দেশের সরকারি ব্যাংকগুলিকে একীভূত করে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ব্যাংক তৈরির জোরালো সুপারিশ করা হয়েছে।

কেন এই মেগা ব্যাংক তৈরির প্রয়োজন? বর্তমানে পরিকাঠামো, উৎপাদন ক্ষেত্র, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করছে ভারত। আর এই ধরনের মেগা প্রজেক্টগুলিতে অবাধে অর্থায়ন করার জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং উচ্চ ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতাসম্পন্ন বৃহৎ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের। আন্তর্জাতিক স্তরের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের বৃহত্তম ব্যাংক হওয়া সত্ত্বেও স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (SBI) বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে বর্তমানে ৪৩তম স্থানে রয়েছে। গত বছরের তথ্য অনুযায়ী, এসবিআই-এর মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৪৬ বিলিয়ন ডলার। অথচ বিশ্বের দশম বৃহত্তম ব্যাংকের সম্পদের পরিমাণ ২.৬ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এমনকি ভারতের ১২টি সরকারি ব্যাংককে একসঙ্গে যুক্ত করলেও বৈশ্বিক শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

একীভূতকরণের চ্যালেঞ্জ ও বর্তমান পরিস্থিতি: অবশ্য ব্যাংক একীভূত করার বিষয়টি নতুন কিছু নয়। এর আগে ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সরকারি ব্যাংকের সংখ্যা ২৭ থেকে কমিয়ে ১২টিতে নামিয়ে আনা হয়েছিল। তবে সেই সময়কার মূল উদ্দেশ্য ছিল দুর্বল ব্যাংকগুলিকে আর্থিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা, এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইএসি-পিএম-এর রিপোর্ট বলছে, শুধু ব্যাংকের আকার বা কলেবর বাড়ালেই সামগ্রিক সাফল্য নিশ্চিত হয় না। ২০২৬ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, মাত্র সাতটি ব্যাংককে তাদের আকারের তুলনায় সম্পূর্ণ দক্ষ হিসেবে পাওয়া গেছে। বিশাল আকারের একীভূতকরণের ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, কর্মী কাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির সঠিক সমন্বয় সাধন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি, সুশাসন এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যদিও প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদ একটি মেগা ব্যাংক তৈরির পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছে, তবে এটি এই মুহূর্তে শুধুমাত্র একটি কৌশলগত প্রস্তাব। ব্যাংকগুলির একীভূতকরণ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বা চূড়ান্ত ঘোষণা করা হয়নি। কিছুদিন আগেই লোকসভায় স্পষ্ট করে জানানো হয়েছিল যে বিষয়টি এই মুহূর্তে সরাসরি বিবেচনাধীন নয়। তা সত্ত্বেও, বর্তমান অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতিতে এই জল্পনা এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। ডিসেম্বর ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক ঋণের বাজারে সরকারি খাতের ব্যাংকগুলির অংশীদারিত্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪.৪ শতাংশে। এর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে বিদেশি মূলধন বিনিয়োগ বা এফডিআই-এর (FDI) সীমা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪৯ শতাংশ করার মতো দূরদর্শী বিকল্পগুলি নিয়ে মহলে জোরদার আলোচনা চলছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *