প্রথম রাখি কে কাকে বেঁধেছিল জানেন? জেনেনিন এই উৎসবের শুরু কী ভাবে হয়েছিল?

হাতে একগাছি সুতো, অথচ তার শক্তি পাহাড়ের চেয়েও অনেক বেশি—রাখিবন্ধন মানেই ভাই-বোনের একরাশ খুনসুঁটি, পবিত্র ভালোবাসা আর আজীবন সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি। এই বিশেষ দিনে বোনেরা পরম স্নেহে ভাইয়ের হাতে রাখি পরিয়ে তাঁদের দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনা করেন। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, এই সর্বজনীন উৎসবের আসল সূচনা হয়েছিল কী ভাবে? বা ইতিহাসের পাতায় প্রথম রাখি কে কাকে বেঁধেছিলেন? চলুন জেনে নেওয়া যাক এর নেপথ্যের কিছু চমকপ্রদ পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক কাহিনি।
১. ইন্দ্রাণী ও দেবরাজ ইন্দ্রের আখ্যান
পুরাণ ও শাস্ত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাখির সূচনা কিন্তু আদতে কোনো ভাই-বোনের সম্পর্কের মধ্যে হয়নি। ভবিষ্যৎ পুরাণ অনুসারে, একসময় দেব ও অসুরদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে প্রবল যুদ্ধ চলছিল। সেই যুদ্ধে দেবরাজ ইন্দ্র প্রায় পরাজয়ের মুখে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। স্বামীর এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে তাঁর সুরক্ষা কামনায় স্ত্রী শচী দেবী একটি পবিত্র সুতো প্রস্তুত করেন। এরপর সেই মন্ত্রপূত সুতো তিনি ইন্দ্রের ডান হাতে বেঁধে দেন। বিশ্বাস করা হয়, এর পরেই অলৌকিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ইন্দ্র যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন। অনেকের মতেই এই ঘটনার মাধ্যমেই রাখির প্রথম প্রচলন হয়েছিল।
২. দেবী লক্ষ্মী ও রাজা বলির কাহিনি
হিন্দু পৌরাণিক শাস্ত্রে দেবী লক্ষ্মী ও বলি রাজাকে কেন্দ্র করেও একটি বিশেষ প্রচলিত গল্প রয়েছে। ভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে ভগবান নারায়ণ একসময় পাতালপুরী পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। দীর্ঘকাল বৈকুণ্ঠে স্বামী ফিরে না আসায় চিন্তিত হয়ে পড়েন দেবী লক্ষ্মী। এরপর তিনি এক সাধারণ নারীর ছদ্মবেশে পাতালে গিয়ে বলি রাজার হাতে রাখি বাঁধেন এবং তাঁকে ভাই হিসেবে গ্রহণ করেন। পরে উপহার চাওয়ার সময় লক্ষ্মী দেবী নিজের আসল পরিচয় প্রকাশ করে নারায়ণকে বৈকুণ્ঠে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান। বোনের মর্যাদা রাখতে রাজা বলি তৎক্ষণাৎ নারায়ণকে মুক্ত করে দেন।
৩. শ্রীকৃষ্ণ ও দ্রৌপদীর অক্ষয় বন্ধন
মহাভারতের যুগে ভাই-বোনের স্নেহের অন্যতম সেরা নিদর্শন হলো শ্রীকৃষ্ণ ও দ্রৌপদীর সম্পর্ক। একবার যুদ্ধ বা অন্য কোনো কারণে শ্রীকৃষ্ণের আঙুল কেটে রক্তপাত শুরু হলে তা দেখে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে দ্রৌপদী নিজের শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে কৃষ্ণের আঙুলে শক্ত করে বেঁধে দেন। দ্রৌপদীর এই আকস্মিক স্নেহে অত্যন্ত মুগ্ধ হন কৃষ্ণ। তিনি কথা দেন, ভবিষ্যতে বিপদের দিনে তিনি সর্বদা দ্রৌপদীর পাশে থাকবেন। পরবর্তীতে কুরুসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের লজ্জাজনক মুহূর্তে সেই কথা রেখে তাঁকে রক্ষা করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ।
৪. রানি কর্ণাবতী ও মুঘল সম্রাট হুমায়ুন
রাখির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক রোমাঞ্চকর ঐতিহাসিক পটভূমিও। ষোড়শ শতকে মেবারের ওপর আক্রমণ চালান গুজরাতের সুলতান বাহাদুর শাহ। বিপন্ন রাজ্য ও নিজের সম্মান বাঁচাতে মেবারের রানি কর্ণাবতী মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের কাছে একটি রাখি পাঠিয়ে সাহায্যের আর্জি জানান। রানিকে বোন হিসেবে গ্রহণ করে তাঁর সম্মান রক্ষার্থে সৈন্যবাহিনী নিয়ে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন হুমায়ুন। যদিও এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মহলে নানা বিতর্ক ও মতপার্থক্য রয়েছে।
৫. যম ও যমুনার স্নেহের প্রতীক
অন্য এক পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর দেবতা যম ও তাঁর বোন যমুনার কাহিনীও অত্যন্ত জনপ্রিয়। দেবী যমুনা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁর ভাই যমের কপালে তিলক পরিয়ে হাতে রাখি বেঁধেছিলেন। বোনের এই অকৃত্রিম স্নেহে অত্যন্ত প্রীত হয়ে যমরাজ বর দিয়েছিলেন যে, যে ভাই নিয়ম মেনে বোনের কাছ থেকে এই পবিত্র সুতো গ্রহণ করবে, সে দীর্ঘায়ু লাভ করবে।
নানা মুনির নানা মত এবং বিভিন্ন পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক কাহিনি প্রচলিত থাকলেও, প্রথম রাখি ঠিক কে কাকে বেঁধেছিলেন, তার নির্দিষ্ট কোনো অকাট্য প্রমাণ আজও নেই। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্ত বিশ্বাস ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনেই আজকের রাখিবন্ধন এক চিরন্তন ও সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।