১৯৯২-এর ভয়ংকর বন্যায় মুছে গিয়েছিল পদ্মের রাজ্য! দীর্ঘ ৩৪ বছর পর আজ ঠিক কী এমন ঘটল কাশ্মীরে?

শতদলের রূপে একসময় যার খ্যাতি ছিল চারদিকে, সেই রূপ হারিয়ে গিয়েছিল আজ থেকে ৩৪ বছর আগেই। যে দিঘিতে স্থানীয় মানুষ একসময় দেদার মাছ ধরতেন, যার একটা বিশাল অংশ জুড়ে থরে থরে ফুটে থাকত পদ্ম আর প্রচুর পরিমাণে ফলত পানিফল—সময়ের নিয়মে সে সবই যেন এক সুদূর অতীত স্মৃতি।

১৯৯২ সালের এক ভয়ংকর বন্যায় সেই দিঘির জল উপচে চারপাশ ভেসে গিয়ে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছিল। সেই থেকেই ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে পদ্ম ফোটা, যা গত তিন দশকেরও বেশি সময়ে এসে একদম শূন্যে ঠেকেছিল। কাশ্মীরের বিখ্যাত উলার দিঘিতে যে একসময় বুক চিরে পদ্ম ফুল ফুটত, তা স্থানীয়রাই প্রায় ভুলতে বসেছিলেন। কিন্তু সমস্ত দীর্ঘশ্বাসের অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘ ৩৪ বছর পর সেই উলার দিঘির জলে ফের মাথা তুলেছে পদ্ম। আর গোলাপি পাপড়ির সেই চেনা মেজাজ দেখে আবেগাপ্লুত ও আপ্লুত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

পদ্মের সুস্বাদু ডাঁটি আর স্থানীয় রান্নার ঐতিহ্য
সাধারণত অগভীর জলেই পদ্ম সবচেয়ে ভালো ফোটে, যদিও মাঝে মাঝেই ভারী বর্ষণের জেরে এর উৎপাদনে কিছু বাধার সৃষ্টি হয়। তবে এত প্রতিকূলতার পরেও এবার উলার দিঘির জলে পদ্মের বাড়বাড়ন্ত এক অন্য আনন্দের সৃষ্টি করেছে। কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের জীবনে পদ্ম কেবল একটি ফুলমাত্র নয়, এর ডাঁটি বা কাণ্ডও তাঁদের দৈনন্দিন আহারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

স্থানীয় ভাষায় এই পদ্ম ডাঁটিকে বলা হয় ‘নাদরু’। এই নাদরু দিয়ে এখানকার মানুষ অত্যন্ত সুস্বাদু এবং জনপ্রিয় একটি পদ রান্না করেন, যা স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু ১৯৯২ সালের পর থেকে দিঘি থেকে পদ্ম প্রায় উধাও হয়ে যাওয়ায় সেই প্রিয় নাদরুর রান্নাও প্রায় অধরা হয়ে পড়েছিল। এখন দিঘি জুড়ে আবার পদ্ম ফুটতে শুরু করায় পুরোনো সেই রান্নার সুবাস ফিরছে স্থানীয় মানুষের হেঁশেলে।

কীভাবে সম্ভব হলো এই রূপকথার প্রত্যাবর্তন?
৩৪ বছর আগের সেই হারিয়ে যাওয়া রূপ হুট করে একদিনে ফিরে আসেনি। এর নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘ পরিকল্পনা ও কঠোর পরিশ্রম। ২০২০ সালে উলার লেক সংস্কারের বা পুনরুজ্জীবনের বিশেষ কাজ শুরু হয়। জলের তলার জমে থাকা সমস্ত জঞ্জাল সাফ করা হয়, বাড়ানো হয় দিঘির নাব্যতা এবং জল যেন সবসময় স্বচ্ছ ও টলটলে থাকে, তার জন্য নেওয়া হয় একাধিক প্রশাসনিক ও পরিবেশগত পদক্ষেপ।

অবশেষে সেই দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের সুফল হাতেনাতে মিলল। তিরিশ বছরেরও বেশি সময় পর উলার দিঘি তার পুরোনো কান্তি ফিরে পেয়ে আজ ফের পদ্মফুলে ভরে উঠেছে। প্রকৃতির এই স্বতঃস্ফূর্ত পুনরুজ্জীবন শুধু যে দিঘির বাস্তুতন্ত্রকে ফিরিয়ে এনেছে তা নয়, সাথে ফিরিয়ে দিয়েছে একসময়ের হারিয়ে যাওয়া সোনালী দিনগুলোর স্মৃতিও।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *