কিবোর্ডে আঙুল নাকি খাতা-পেন! ঝড়ের গতিতে টাইপ করার অভ্যাস কি কমিয়ে দিচ্ছে ব্রেন পাওয়ার?

শেষ কবে আপনি পেন দিয়ে খাতায় নিজের হাতে কিছু লিখেছেন, তা কি মনে আছে? আজকের এই আধুনিক মোবাইল আর ল্যাপটপের যুগে খাতা-পেনের চিরচেনা জায়গাটি ধীরে ধীরে দখল করে নিয়েছে কিবোর্ড আর টাচস্ক্রিন। বাজারের ছোট্ট ফর্দ তৈরি করা থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের পরীক্ষার পড়া, আজকাল সবই আঙুলের ছোঁয়ায় ঝড়ের গতিতে টাইপ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই সহজ এবং আরামদায়ক অভ্যাসটি কি অজান্তেই আমাদের মেধা বা ব্রেন পাওয়ারের মারাত্মক ক্ষতি করছে? বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক গবেষণা কিন্তু অত্যন্ত চমকে দেওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে। গবেষকদের দাবি, কিবোর্ডে আঙুল চালিয়ে দ্রুত টাইপ করার চেয়ে খাতা-পেন দিয়ে হাতে লিখলে মস্তিষ্ক অনেক বেশি সজাগ ও সক্রিয় থাকে এবং যেকোনো তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

এই বিষয়ে দীর্ঘ গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, যখন একজন মানুষ পেন দিয়ে কাগজে কোনো অক্ষর বা শব্দ লেখেন, তখন তার চোখ, হাত এবং মাথার স্নায়ুগুলি একসঙ্গে অত্যন্ত সুচারুভাবে কাজ করতে শুরু করে। আঙুল কীভাবে ঘুরছে, অক্ষরের নির্দিষ্ট গঠন বা চেহারা কেমন হবে—এই সমস্ত কিছু একসঙ্গে ভাবতে গিয়ে মাথার মধ্যে একটি দারুণ কার্যকরী সংযোগ তৈরি হয়। স্নায়ুবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় আলফা ও থিটা তরঙ্গ। মূলত এই বিশেষ তরঙ্গের কারণেই পড়া বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য খুব সহজেই আমাদের মস্তিষ্কের গভীরে গেঁথে যায় এবং দীর্ঘ দিন ধরে মনে থাকে। এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় টাইপ করার সময়। কিবোর্ডে টাইপ করার সময় আমরা মূলত একই ধরনের বোতামে বারবার আঙুল ছুঁইয়ে যাই, যার ফলে মস্তিষ্কের খুব বেশি অংশ খাটানোর বা সক্রিয় হওয়ার সুযোগ থাকে না।

বিভিন্ন গবেষণায় আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। ক্লাসে বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে যাঁরা টাইপ করার পরিবর্তে নিজেদের হাতে নোট লেখেন, তাঁরা যেকোনো জটিল বিষয় অনেক দ্রুত বুঝতে পারেন। এর মূল কারণ হলো, মানুষের মুখের দ্রুত কথার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাতে লেখা সম্পূর্ণ হুবহু তুলে নেওয়া অসম্ভব। তাই মানুষ আগে অন্যের কথা মন দিয়ে বোঝে, তারপর সেই বিষয়টি নিজের মতো করে সংক্ষেপে সুন্দর করে সাজিয়ে খাতায় লিখে রাখে। এর ফলে সেই বিষয়টির মূল অর্থ মাথার মধ্যে একেবারে পরিষ্কার হয়ে যায়। উল্টো দিকে, কম্পিউটারের কীবোর্ডে টাইপ করার সময় অনেকে না বুঝেই শুধু একটানা কথা বা টেক্সট তুলে যান, যা একটু পরেই মাথা থেকে পুরোপুরি মুছে যায়।

বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে খাতা-পেন ধরে হাতে লেখার অভ্যাস আরও অনেক বেশি জরুরি। পেন্সিল বা পেন ধরলে তাদের ভাষা, বানান ও অক্ষর চেনার ভিত অত্যন্ত শক্ত হয়। এমনকি কেউ যদি ডিজিটাল ট্যাবলেটের পর্দায় বিশেষ স্টাইলাস বা ডিজিটাল পেন ব্যবহার করেও লেখেন, তাতেও ঐতিহ্যবাহী খাতা-পেনের মতোই সমান উপকার পাওয়া যায়। এর মানে অবশ্য এই নয় যে টাইপিং বা কিবোর্ডের ব্যবহার পুরোপুরি খারাপ। অফিসের জরুরি ও দ্রুত কাজ কিংবা বিশাল আকারের কোনো রিপোর্ট বা চিঠি লেখার জন্য টাইপিং ভীষণ দরকারি। কিন্তু পড়াশোনা পাকাপাকিভাবে মনে রাখতে, চিন্তাশক্তিকে ধারালো করতে কিংবা সামগ্রিক বুদ্ধিমত্তা ও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতে আজও খাতা-পেনের কোনো বিকল্প নেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *