আইফোনের ইএমআই শোধ করতে গিয়ে চরম পরিণতি! ভারতের অর্থনৈতিক বাস্তবতার নেপথ্যে লুকিয়ে কোন ভয়ংকর সত্য?

ভারতের অর্থনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে, আর সেই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের চাহিদা ও মানসিকতাও। সম্প্রতি আইফোনের ইএমআই (EMI) শোধ করতে না পেরে মহারাষ্ট্রে এক পরিবারের তিন সদস্যের আত্মহত্যার মর্মান্তিক ঘটনা বা হায়দরাবাদে আইফোন কেনাকে কেন্দ্র করে স্বামীর সঙ্গে ঝামেলার জেরে গৃহবধূর আত্মঘাতী হওয়ার মতো ঘটনাগুলি দেশজুড়ে গভীর শোরগোল ফেলে দিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে ঘটনাগুলি বিচ্ছিন্ন মনে হলেও, এর নেপথ্যে রয়েছে ভারতীয়দের উপার্জন ও খরচের ক্রমবর্ধমান ব্যবধানের এক কঠিন বাস্তবতা। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের (RBI) পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে ভারতীয়দের অনেকেই এমন জিনিস কেনার জন্য ঋণ নিচ্ছেন যা তাঁদের প্রকৃত উপার্জনের সঙ্গেই সংগতিপূর্ণ নয়।
স্টেটাস সিম্বল বনাম সাধ্যের বাইরে ইএমআই: আজকের প্রজন্মের একটা বড় অংশের কাছে আইফোন বা যেকোনো প্রিমিয়াম স্মার্টফোন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি ‘স্টেটাস সিম্বল’। আর সেই কারণেই হু হু করে বাড়ছে গ্যাজেট কেনার জন্য ইএমআই-এর ব্যবহার। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইএমআই নিজে থেকে খারাপ কিছু নয়, কিন্তু সাধ্যের বাইরে গিয়ে তাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারলে বড় বিপদ ডেকে আনে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালে ভারতে যে পরিমাণ স্মার্টফোন বিক্রি হবে, তার প্রায় ৪২ শতাংশই হবে ইএমআই-এর মাধ্যমে। আর যদি শুধুমাত্র প্রিমিয়াম স্মার্টফোনের কথা ধরা হয়, যেখানে আইফোনের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি, তবে এই হার গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬৬ শতাংশে! সাধারণত অন্য কোনো স্মার্টফোন কিনলে তার লোন ১০ মাসের মধ্যে শোধ হয়ে গেলেও, আইফোনের ক্ষেত্রে সেই সময়কাল ১৭ মাস বা তার বেশি সময় ধরে চলে। এর অর্থ হলো, ক্রেতা নিজের মাসিক খরচ কমিয়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জালে জড়িয়ে নিজের সাধ্যের অতিরিক্ত মূল্যের জিনিস কিনছেন।
আয় বনাম ঋণের পাহাড়: পিরিয়ডিক লেবার ফোর্সের সার্ভে অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে একজন সাধারণ ভারতীয় চাকুরিজীবীর গড় মাসিক উপার্জন ছিল মাত্র ২০,৭০০ টাকা। এমনকি আয়করের হিসাব বলছে, প্রতি ১০০ জন বেতনভোগীর মধ্যে ১ জনেরও কম মানুষ মাসে ১ লক্ষ টাকা বা তার বেশি উপার্জন করেন। ফলে ৭০-৭৫ হাজার টাকার আইফোন কেনা দেশের সাধারণ মধ্যবিত্তের ক্ষেত্রে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের।
এদিকে, ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের (RBI) প্রকাশিত ফাইন্যান্সিয়াল স্টেবিলিটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ভারতের পারিবারিক ঋণ (Household Debt) ছিল দেশের জিডিপির ৪১.৩ শতাংশ। কিন্তু মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে ২০২৬ সালের জুন মাসের রিপোর্ট বলছে, সেই ঋণ বেড়ে একলাফে জিডিপির ৪৫.৫ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছে! এর মধ্যে পার্সোনাল লোন, ক্রেডিট কার্ড এবং কনজিউমার ডিউরেবল লোনের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
জেন-জির ঋণ সংস্কৃতি ও অর্থনীতির দুই চিত্র: সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমানের জেন-জি (Gen-Z) প্রজন্ম খুব সহজেই ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে। সিবিলের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যাঁরা নতুন লোন নিয়েছেন, তাঁদের ৪১ শতাংশই জেন-জি। আর এদের একটা বড় অংশই বাড়ি বা গাড়ি নয়, বরং ক্রেডিট কার্ড বা কনজিউমার ডিউরেবল লোন দিয়েই তাঁদের ঋণ নেওয়ার পথ শুরু করছেন।
বর্তমানে ভারতের অর্থনীতির সামনে দুটি স্পষ্ট ছবি ভেসে উঠেছে। একদিকে দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল এবং ঋণখেলাপির হার কিছুটা কমলেও, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ভোগ্যপণ্য কেনার জন্য অতিরিক্ত ঋণনির্ভর হয়ে পড়ছে। তাই এই সংকট কেবল একটি আইফোনের ইএমআই শোধ করার লড়াই নয়, বরং সামগ্রিক পারিবারিক ঋণ সংস্কৃতি যে নীরবে এক মারাত্মক অর্থনৈতিক চাপের সৃষ্টি করছে, এই ঘটনাগুলি তারই এক চরম সতর্কবার্তা।