সুপ্রিয়ার সঙ্গে সংসার, তবুও কেন গভীর রাতে গৌরী দেবীকে চিঠি লিখতেন উত্তম? ফাঁস হল মহানায়কের এক অপূর্ণ স্বপ্ন

অভিনেত্রী সুপ্রিয়া চৌধুরীর সঙ্গে মহানায়ক উত্তম কুমারের সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং ময়রা স্ট্রিটের ফ্ল্যাটে তাঁদের সংসার নিয়ে তৎকালীন টালিগঞ্জে গুঞ্জনের অন্ত ছিল না। একদিকে ভবানীপুরের পৈতৃক ভিটেয় স্ত্রী গৌরী দেবী, আর অন্যদিকে সুপ্রিয়াকে নিয়ে নতুন জীবন—এই দ্বৈত জীবনের গুঞ্জন সংবাদমাধ্যমে কখনও মুখ খোলায় পৌঁছায়নি। তবে লোকচক্ষুর অন্তরালে দূরত্ব যতই থাকুক না কেন, গৌরী দেবীর সঙ্গে উত্তমের মনের এক গভীর মেলবন্ধন বজায় ছিল, যার প্রমাণ মেলে তাঁদের গোপনীয় চিঠিপত্র আদান-প্রদানে। তেমনই একটি চিঠিতে লুকিয়ে রয়েছে মহানায়কের জীবনের এক কঠিন লড়াই ও অপূর্ণ ইচ্ছার গল্প।

মুম্বইয়ে মাথা গোঁজার লড়াই ও গৌরী দেবীর বায়না

তৎকালীন বম্বে বা বর্তমান মুম্বইয়ের মায়ানগরীতে যখন নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে আপ্রাণ লড়ছেন উত্তম কুমার, তখন গৌরী দেবী নাছোড়বান্দার মতো বায়না ধরেছিলেন স্বামীর কাছে চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু তিলোত্তমার তুলনায় বম্বের জীবনযাত্রার খরচ ছিল আকাশছোঁয়া। স্ত্রীকে সামনে রেখে সেই বাস্তব পরিস্থিতি বুঝিয়ে উঠতে না পেরে শেষ পর্যন্ত মুম্বই থেকেই গৌরীদেবীকে একটি নাতিদীর্ঘ চিঠি লেখেন উত্তম।

‘উত্তম একশো’ ও ‘কৃত্তিবাস’ সূত্রে প্রকাশিত সেই চিঠির ছত্রে ছত্রে লুকিয়ে ছিল মহানায়কের চরম আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং একলা লড়াইয়ের গভীর যন্ত্রণা। স্ত্রীকে ভালোবেসে ‘গজু’ বলে ডেকে উত্তম লিখেছিলেন, “মানুষ ভাবে এক, আর হয় এক।” কলকাতা থেকে বম্বে বা মাদ্রাজ গিয়ে কেরিয়ারের কাজ শেষ করার কথা ভাবলেও বাস্তব ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। একের পর এক প্রযোজক পিছু হটছিলেন, আর কলকাতা থেকে শিল্পীদের বম্বে নিয়ে যাওয়াও ছিল অসম্ভব।

ছয়শো টাকার ফ্ল্যাট ভাড়ার টানাপোড়েন

চিঠিতে নিজের আক্ষেপের কথা প্রকাশ করে উত্তম লিখেছিলেন, মুম্বইতে একটি দু-কামরার ফ্ল্যাট তিনি পছন্দ করেছিলেন কেবল গৌরীদেবীকে নিজের কাছে এনে রাখার জন্যই। কিন্তু সেই সময়ে মাসে ৬০০-৭০০ টাকা ভাড়ার সঙ্গে আসবাবপত্রের বাড়তি ৩০০ টাকা সামলানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য তাঁর ছিল না। বাজারে তখন জাঁকিয়ে বসেছিল ধারের পাহাড়, এমনকী রোজকার খাওয়ার খরচ চালানোই হয়ে উঠেছিল দুরূহ। চিঠিতে আক্ষেপ করে তিনি লিখেছিলেন, “টাকাই যদি না আসে কার ভরসায় আমি ফ্ল্যাট নেব? আর আমিই বা না খেয়ে কতদিন এখানে পড়ে থাকব?”

স্ত্রীর প্রতি সান্ত্বনা ও অটুট ভালোবাসা

চিঠির শেষাংশে স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়ে মহানায়ক লিখেছিলেন, “তুমি একেবারে মন খারাপ করো না! আমাকে নিয়ে কোনও গুঞ্জন তৈরি হলে, কান দিও না… তুমি মন খারাপ করলে, তোমার শরীর খারাপ হবে। আমার জন্য তো অনেক কষ্টই সহ্য করেছ। আর কটা দিন একটু সহ্য কর…ভাল থেকো, ভালবাসা নিও।”

মুম্বইয়ের বুকে গৌরীদেবীকে নিয়ে নতুন করে সংসার বাঁধার সেই স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি ঠিকই, তবে ইতিহাসের পাতায় তা এক প্রবাদপ্রতিম নায়কের না-বলা জীবনের অজানা লড়াই এবং সম্পর্কের গভীরতম আবেগকেই চিরকালের মতো অমর করে রেখেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *