উত্তরাখণ্ডে অভিনব উদ্যোগ! এআই ক্যামেরা আর ড্রোনেই এবার চিতাবাঘের ওপর কড়া নজরদারি

উত্তরাখণ্ড সীমান্তবর্তী মোরাদাবাদ জেলায় চিতাবাঘের উপদ্রব মোকাবিলায় এক অভিনব ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। জেলার ঠাকুরদ্বার ও কান্থ এলাকায় ঘন আখক্ষেতকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে প্রায়শই বাসিন্দাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে বন্যপ্রাণীরা। এই লাগাতার আতঙ্ক কাটাতে এবং সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষার্থে জেলা প্রশাসন রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছে ৩৯.৪৫ লক্ষ টাকার একটি পাইলট প্রকল্প জমা দিয়েছে। এর মাধ্যমে পাঁচটি অত্যন্ত সংবেদনশীল গ্রামের প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে ২৪ ঘণ্টার রিয়েল-টাইম নজরদারি এবং একটি আধুনিক আগাম সতর্কীকরণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই সম্পূর্ণ ব্যবস্থাটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সাহায্যে পরিচালিত হবে। এই ব্যবস্থার মূলে রয়েছে ২০টি নাইট-ভিশন এআই ক্যামেরা, একটি বিশেষ নজরদারি ড্রোন, ১০টি আধুনিক উদ্ধার খাঁচা, ১০০টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টর্চ এবং সৌরবিদ্যুৎ পরিকাঠামো। ক্যামেরাগুলোর মাধ্যমে চিতাবাঘের অবস্থান চিহ্নিত হওয়ার সাথে সাথেই সরাসরি ইন্টিগ্রেটেড কন্ট্রোল রুমে লাইভ অ্যালার্ট পৌঁছে যাবে। এরপর দ্রুত পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমের মাধ্যমে গ্রামবাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার বার্তা দেওয়া সম্ভব হবে।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মমতা মালভিয়া এই বিষয়ে জানান যে, এই পাইলট প্রকল্পটি বন্যপ্রাণীর হামলা থেকে মানবজীবন রক্ষা করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে। প্রকল্পটি সফল হলে এর পরিধি বাড়িয়ে কান্থ এবং ঠাকুরদ্বারের মধ্যবর্তী প্রায় ৫০ কিলোমিটার বিস্তৃত এক বিশাল এলাকা এর আওতায় আনা হবে।

এআই ক্যামেরা ও ড্রোনের মাধ্যমে চলবে অবিরাম নজরদারি

দীর্ঘ ও ঘন আখক্ষেতের কারণে প্রচলিত পদ্ধতিতে চিতাবাঘের সন্ধান পাওয়া এবং টহল দেওয়া বেশ কঠিন। এই সমস্যা সমাধানে মোরাদাবাদ প্রশাসন সম্পূর্ণভাবে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছে। নির্দিষ্ট এলাকার পাঁচটি বড় এবং ১৫টি মাঝারি খুঁটিতে মোট ২০টি এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে, যা নিরবচ্ছিন্নভাবে পাহারা দেবে।

গ্রামীণ অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সমস্যা এড়াতে এই পুরো নজরদারি ব্যবস্থাটি সোলার প্যানেল এবং শক্তিশালী ব্যাটারি ব্যাকআপের মাধ্যমে সচল রাখা হবে। ঘন জঙ্গলে বনকর্মীদের ঝুঁকি কমাতে আড়াই লক্ষ টাকা মূল্যের একটি বিশেষ নজরদারি ড্রোন আকাশ থেকে বন্যপ্রাণীর গতিবিধি লক্ষ্য করবে। ড্রোন সংকেত পাঠানোর পর ১০টি নতুন উদ্ধার খাঁচা ও আধুনিক টর্চ নিয়ে গঠিত বন বিভাগের বিশেষ দল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।

রিয়েল-টাইম সতর্কতা ও সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষ

এই প্রযুক্তির মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে একটি সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বা কন্ট্রোল রুম, যা সরাসরি এআই ক্যামেরাগুলির সাথে যুক্ত থাকবে। কোনো এলাকায় চিতাবাঘ বা অন্য কোনো সন্দেহজনক বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি ধরা পড়ার সাথে সাথেই এআই প্রসেসিং ইউনিটটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও বিশ্লেষণ করে নিখুঁত অবস্থান ও সময়সহ কন্ট্রোল রুমে অ্যালার্ট পাঠাবে।

এরপর সেখান থেকে বহনযোগ্য মেগাফোন ও পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমের মাধ্যমে স্থানীয় লোকজনকে দ্রুত সতর্ক করা হবে। প্রশাসনের মতে, এই স্বয়ংক্রিয় সতর্কতা ব্যবস্থা একদিকে যেমন বড় ধরনের প্রাণহানি রোধ করবে, অন্যদিকে বন বিভাগকে দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালাতে সাহায্য করবে।

৫০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ জুড়ে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা

৩৯.৪৫ লক্ষ টাকার এই প্রকল্পে প্রতিটি সরঞ্জামের জন্য নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ১০টি উদ্ধার খাঁচার জন্য ১০ লক্ষ টাকা এবং ২০টি এআই ক্যামেরার জন্য ৭ লক্ষ টাকা খরচ ধরা হয়েছে। বাকি অর্থ এআই প্রসেসিং বোর্ড, ফোরজি ডাটা ট্রান্সমিশন চিপ, সৌর পরিকাঠামো, এসএসডি স্টোরেজ এবং বজ্রপাত থেকে সুরক্ষার উপাদানে ব্যয় করা হবে।

মোট ১০ সপ্তাহে ছয়টি ধাপে এই পাইলট প্রকল্পটি সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। পাঁচটি গ্রাম দিয়ে শুরু হওয়া এই মডেলের কার্যকারিতা ও নির্ভুলতা যাচাইয়ের পর, ভবিষ্যতে এটিকে কান্থ ও ঠাকুরদ্বারের পুরো ৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্থায়ীভাবে রূপায়ণ করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রশাসনের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *