২৬/১১ মুম্বই হামলা, বাঁচবে না মাস্টারমাইন্ড হাফিজ সইদ? শুরু হচ্ছে বিচার প্রক্রিয়া

২০০৮ সালের ভয়াবহ ২৬/১১ মুম্বই জঙ্গি হামলার ১৮ বছর পর এক ঐতিহাসিক ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ করতে চলেছে ভারত। লস্কর-ই-তৈবার প্রতিষ্ঠাতা এবং এই নৃশংস হামলার মূল চক্রী হাফিজ় সৈয়দ সহ মোট ছয়জন পলাতক অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতেই এবার বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হতে চলেছে। ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে যারা এই জঘন্য কাণ্ড ঘটিয়েছিল এবং বর্তমানে দেশের নাগালে নেই, তাদের আইনি জালে বাঁধতে এই বিশেষ ব্যবস্থা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

সূত্রের খবর অনুযায়ী, হাফিজ় সৈয়দ ছাড়াও অভিযুক্তের তালিকায় রয়েছে জাকির-উর-রহমান লকভি, সাজিদ মীর, আবু আল-কামা, আসিম ওরফে আবু কাহাফা এবং মেজর আবদুল রহমান পাশা। এরা কেউ এখনও পর্যন্ত মুম্বই পুলিশ বা দেশের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে গ্রেপ্তার হয়নি। তবে অপরাধীদের আইনের আওতা থেকে চিরতরে মুক্ত রাখতে চান না তদন্তকারীরা। সেই কারণেই তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। খুব শীঘ্রই এই সংক্রান্ত প্রোক্লেমেশন রিপোর্ট আদালতে দাখিল করবেন বিশেষ সরকারি আইনজীবী উজ্জ্বল নিকম।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইনি প্রক্রিয়াকে ‘ইন অ্যাবসেনশিয়া ট্রায়াল’ বা অনুপস্থিতিতে বিচার বলা হয়। এই বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযুক্তরা সশরীরে আদালতে উপস্থিত না থাকলেও বিচারপ্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে। বিচার চলাকালীন অভিযুক্তদের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে তাদের পক্ষের আইনজীবী নিয়োগেরও আইনি সংস্থান রয়েছে, যাতে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন পুরোপুরি বজায় থাকে। এই বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযুক্তরা দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত তাদের সাজা ঘোষণা করে রাখবে। পরবর্তীতে যখনই বা যেভাবেই ওই জঙ্গিরা গ্রেপ্তার হবে, সেই সাজা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করা হবে। ফলে নতুন করে আবার পুরো বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করার কোনো প্রয়োজন পড়বে না।

প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক প্রকার চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কাঁধে বন্দুক ও প্রাণঘাতী গোলা-বারুদের ঝোলা নিয়ে আরব সাগর পেরিয়ে দক্ষিণ মুম্বইয়ে প্রবেশ করেছিল ১০ জন সশস্ত্র লস্কর জঙ্গি। এরপর টানা তিন দিন ধরে চলেছিল এক পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ও রক্তের হোলি। ঠান্ডা মাথায় নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছিল ১৬৪ জন নিরীহ মানুষকে, যার মধ্যে ২৮ জন বিদেশি নাগরিকও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এছাড়াও এই হামলায় গুরুতর জখম হয়েছিলেন তিন শতাধিক মানুষ।

মুম্বইয়ের মাটিতে পা রেখেই ২৬ নভেম্বর রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ প্রথমে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ টার্মিনাস বা সিএসএমটি রেল স্টেশনে হামলা চালায় দুই জঙ্গি ইসমাইল খান এবং আজমল কাসভ। এরপর একে একে কামা হাসপাতাল, লিওপল্ড ক্যাফে, তাজমহল প্যালেস হোটেল, ওবেরয় ট্রাইডেন্ট রিসর্টের সদর দপ্তর এবং ইহুদিদের প্রার্থনা গৃহ নরিম্যান হাউসে সুপরিকল্পিত হামলা চালানো হয়। টানা ৬০ ঘণ্টা ধরে চলা রক্তক্ষয়ী গুলি বিনিময়ের পর দেশের নিরাপত্তা বাহিনী জঙ্গিদের নিকেশ করতে সক্ষম হয়। একমাত্র আজমল কাসভ ছাড়া এই হামলায় অংশ নেওয়া বাকি সমস্ত জঙ্গিরই মৃত্যু হয়েছিল। ২৭ নভেম্বর ভোরে রক্তাক্ত ও আহত অবস্থায় কাসভকে জীবিত গ্রেপ্তার করে ফেলে পুলিশ। পরবর্তীতে ৩০ নভেম্বর পুলিশের জেরায় সে নিজের অপরাধের কথা সম্পূর্ণ কবুল করেছিল। এখন পলাতক মাস্টারমাইন্ডদের অনুপস্থিতিতে এই বিচারপ্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক ও জাতীয়স্তরে এক নতুন বার্তা দিতে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *