সিকিমে ঢুকছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা! পারমিট নিয়ে বড় সিদ্ধান্তের মাঝেই বড় প্রশ্ন তুললেন উত্তরের ব্যবসায়ীরা

পাহাড়ি রাজ্য সিকিমের পর্যটন খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হতে চলেছে। পর্যটন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, গতিশীল এবং সুরক্ষিত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালিত ‘ইন্টিগ্রেটেড অনলাইন পারমিট সিস্টেম’ চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সিকিম সরকার। মূলত পারমিট ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের গলদ এবং কোটি কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতি বন্ধ করতেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সরকারের এই পদক্ষেপে সিকিমের রাজস্ব বাড়ার আশা তৈরি হলেও, তা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগের সুর শোনা গেছে উত্তরবঙ্গের পর্যটন ব্যবসায়ীদের গলায়।

রাজস্ব ফাঁকির চাঞ্চল্যকর চিত্র

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সিকিমে মোট ১৭.১২ লাখ পর্যটক এসেছিলেন এবং ২০২৬ সালের মে মাসের শেষ নাগাদ এই সংখ্যা ইতিমধ্যে ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। তবে বিপুল সংখ্যক পর্যটক আসার পরেও রাজ্যের সরকারি কোষাগারে সঠিক পরিমাণ রাজস্ব জমা হচ্ছিল না। বিশেষ করে, ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কেবল নাথুলাতেই প্রায় ১৫.৬৭ লক্ষ পর্যটক ভ্রমণ করেছিলেন। মাথাপিছু ২০০ টাকা পারমিট ফি অনুযায়ী যেখানে প্রায় ৩১ কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব জমা হওয়ার কথা ছিল, সেখানে কোষাগারে এসেছে মাত্র ৩ কোটি টাকা! অর্থাৎ কেবল নাথুলা সার্কিট থেকেই প্রায় ২৭ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি বা ‘রেভিনিউ লিক’ হয়েছে। শতকরা হিসেবে সরকারের প্রায় ৭৭ শতাংশ রাজস্বই মাঝপথে হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল প্রশাসনের কপালে।

নতুন ব্যবস্থার রূপরেখা ও মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাস

এই অনিয়ম রুখতে সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং (গোলে) জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত এই অনলাইন পারমিট ব্যবস্থা এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং সমস্ত স্টেকহোল্ডারদের মতামত নিয়েই চূড়ান্ত পদক্ষেপ করা হবে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সরকার কোনও বেসরকারি সংস্থাকে এই ব্যবস্থা বিক্রি করছে না; বরং যে সংস্থাকে পোর্টাল তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হবে, তারা কেবল ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’ হিসেবে কাজ করবে। পারমিটের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ ও তথ্য থাকবে পর্যটন বিভাগের হাতেই।

স্থানীয় পর্যটন ব্যবসাকে উৎসাহিত করতে এবং বহিরাগত এজেন্টদের একচেটিয়া প্রভাব রুখতে এই পোর্টালে ‘জিও-ফেন্সিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। ফলে কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই বা শিলিগুড়ির মতো বাইরের অঞ্চল থেকে সরাসরি কেউ এই পোর্টাল থেকে পারমিট নিতে পারবে না। কেবল সিকিমে নিবন্ধিত স্থানীয় ট্যুর অপারেটর ও ট্রাভেল এজেন্টদেরই পারমিট আবেদনের অধিকার দেওয়া হবে। ছাঙ্গু লেক, নাথুলা, বাবা মন্দির, লাচেন, লাচুং ও গুরুডোংমারের মতো সংরক্ষিত এলাকাগুলির জন্যই এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।

উত্তরবঙ্গের ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

সিকিম সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও, উত্তরের পর্যটন বিশেষজ্ঞ ও ট্যুর অপারেটররা কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন তুলেছেন। কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির পর্যটন বিভাগের চেয়ারম্যান সম্রাট সান্যাল জানান, দার্জিলিং বা কালিম্পংয়ে ঘুরতে আসা পর্যটকদের সিংহভাগই সিকিমে যান। তাই রাজস্ব চুরি রোধে সরকারি পোর্টাল ভালো উদ্যোগ হলেও, এর রূপায়ণ যেন সুচিন্তিত হয়।

অন্যদিকে, ইস্টার্ন হিমালয়ান ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেবাশিস মৈত্র আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সিকিম যে পোর্টালে কেবল স্থানীয় ট্যুর অপারেটরদের অনুমতি দেবে, তার থেকে পশ্চিমবঙ্গকে আলাদা রাখলে তার বিরূপ প্রভাব উত্তরবঙ্গের পর্যটনেও পড়বে। কারণ উত্তরবঙ্গ ছাড়া সিকিমে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। প্রক্রিয়া সরলীকরণ করা জরুরি হলেও, এর ফলে যেন সাধারণ পর্যটকদের কোনো হয়রানি না বাড়ে, সেদিকে নজর দেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *