ট্রাফিকের ই-চালান পেমেন্ট না করে ভুলে গেছেন? অজান্তেই যে বড় বিপদে পড়তে চলেছেন, জানেন কি?

রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বেরোলে ট্রাফিক চালান বা জরিমানা কাটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু ট্র্যাফিক চালান পাওয়ার পর অনেকেই ধরে নেন যে এটি পরে মিটিয়ে দেওয়া যাবে বা কিছুদিন কেটে গেলে চালানটির মেয়াদ নিজে থেকেই ফুরিয়ে যাবে। অনেকেরই ধারণা থাকে যে চালান এড়িয়ে চললে হয়তো তা এক সময় আপনাআপনি মুছে যাবে। কিন্তু বাস্তবে এমন কোনো সুযোগ নেই। ট্র্যাফিক চালান উপেক্ষা করার পরিণতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। সময়মতো এই জরিমানা পরিশোধ না করলে মামলা সোজা আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে, যার জেরে আপনার গাড়ি সংক্রান্ত বিভিন্ন জরুরি কাজে বড় ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
১. গাড়ির নথিতে পাকাপাকিভাবে থেকে যায় ই-চালান
ই-চালানের সবচেয়ে বড় দিক হলো এটি আপনার গাড়ির সরকারি রেকর্ডে স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত থাকে। আপনার গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বরের (RC) সঙ্গেই এই চালান যুক্ত হয়ে যায়। ফলে নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেও এই চালান সহজে বাতিল হয় না। এমনকি কিছু রাজ্য এবং নির্দিষ্ট কিছু ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বিলম্বে অর্থ পরিশোধ করলে জরিমানা আরও কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। পরবর্তীতে যখনই আপনার গাড়ির নথি বা ট্র্যাক রেকর্ড পরীক্ষা করা হবে, তখনই এই বিচারাধীন চালানের তথ্য সামনে চলে আসবে।
২. বিষয়টি গড়ায় সোজা ট্রাফিক আদালতে
সমস্ত ট্রাফিক চালান সবসময় অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে সাধারণ পেমেন্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি বকেয়া চালান পরিশোধ করা না হয়, তবে ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ সেই মামলা সরাসরি ট্রাফিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠিয়ে দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে গাড়ির মালিকের নামে আদালতে হাজির হওয়ার নোটিশ জারি হতে পারে, যা আপনার রেজিস্টার্ড মোবাইল নম্বরেও পাঠানো হয়। কিন্তু কোনো কারণে আপনার মোবাইল নম্বরটি যদি পুরোনো হয়ে যায় বা আপনি নোটিশটি সময়মতো দেখতে না পান, তবে আদালতের শুনানির বিষয়টি আপনার অজান্তেই থেকে যাবে।
৩. আদালতে উপস্থিত না থাকলে হতে পারে একতরফা সিদ্ধান্ত
আদালতের নির্ধারিত দিনে যদি গাড়ির মালিক নিজে উপস্থিত না থাকেন কিংবা মামলার সময় বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য আইনি আবেদন না করেন, তবে কিছু ক্ষেত্রে আদালত তাঁর অনুপস্থিতিতেই বড় রায় দিতে পারে। আইনগত ভাষায় এটিকে ‘একতরফা কার্যধারা’ বা ‘এক্স-পার্টি প্রসিডিংস’ (Ex-parte proceedings) বলা হয়। এর ফলে পরবর্তী সময়ে সরাসরি আদালতের সমন জারি হতে পারে। অর্থাৎ, বিষয়টি তখন আর শুধু একটি মোবাইল ইনভয়েস বা সাধারণ জরিমানার মধ্যে সীমিত থাকে না, বরং এটি একটি গুরুতর আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
৪. প্রভাবিত হয় ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং গাড়ির রেজিস্ট্রেশন (RC)
কোনো ট্রাফিক চালান সংক্রান্ত সমস্যা যদি দীর্ঘ সময় ধরে অমীমাংসিত অবস্থায় পড়ে থাকে, তবে সরকারি যানবাহন রেকর্ড সিস্টেমে আপনার গাড়িটি ‘চিহ্নিত’ বা ফ্ল্যাগড হয়ে যেতে পারে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট বা আরসি সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে। বিশেষ করে বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি ছোটানো বা মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আদালত সরাসরি চালকের লাইসেন্স স্থগিত বা চিরতরে বাতিল করার সুপারিশ পর্যন্ত করতে পারে।
৫. পুরোনো গাড়ির ক্রেতা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বড় বাধা
আপনার গাড়ির বিরুদ্ধে যদি একাধিক বকেয়া ইনভয়েস বা চালান জমে থাকে, তবে তা গাড়ি বিক্রির প্রক্রিয়াকেও দারুণভাবে ব্যাহত করতে পারে। বর্তমানে যেকোনো পুরোনো গাড়ি কেনার আগে ক্রেতা নিজে অথবা বিভিন্ন প্রি-ওন্ড কার প্ল্যাটফর্ম গাড়ির পেপার্স ও অনলাইন রেকর্ড পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে নেয়। গাড়ির বিরুদ্ধে পুরোনো চালান বকেয়া থাকলে সচেতন ক্রেতা দাম নিয়ে দরকষাকষি করতে পারেন কিংবা চুক্তি থেকে সম্পূর্ণ সরেও দাঁড়াতে পারেন। পাশাপাশি, নতুন করে গাড়ি বীমা বা ইনস্যুরেন্স করার সময়ও অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানির নিয়মানুযায়ী এই রেকর্ড খতিয়ে দেখা হতে পারে।
বকেয়া চালান থাকলে আপনার করণীয় কী?
আপনার গাড়ির বিরুদ্ধে অতীতে কোনো ট্রাফিক চালান বকেয়া রয়েছে বলে সন্দেহ হলে, দেরি না করে সবার আগে অফিসিয়াল পোর্টালে গিয়ে সেটির বর্তমান অবস্থা যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অনলাইনে থাকা চালান খুব দ্রুত ও সহজেই পেমেন্ট করা যায়। তবে বিষয়টি যদি আদালত পর্যন্ত গড়ায়, তবে সংশ্লিষ্ট আদালতের নির্দিষ্ট কার্যপ্রণালী অনুযায়ী তার সমাধান করতে হবে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ট্রাফিক চালান বা জরিমানা এড়িয়ে গেলে সমস্যার সমাধান তো হয়ই না, বরং তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আইনি জটিলতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। তাই আপনার নামে কোনো বকেয়া চালান ঝুলে থাকলে, যত দ্রুত সম্ভব তা যাচাই করে নিষ্পত্তি করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।