হিন্ডেনবার্গের ধাক্কা অতীত! ফের ভারতের সেরা পারফর্মিং স্টক হয়ে রেকর্ড গড়ল আদানি এন্টারপ্রাইজেস

এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী গৌতম আদানির প্রধান সংস্থা আদানি এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেড অবশেষে ফিরে এসেছে তার তিন বছর আগের সেই গৌরবময় অবস্থানে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে হিন্ডেনবার্গ রিসার্চের শর্ট-সেলার রিপোর্টের জেরে যে বিরাট সংকট তৈরি হয়েছিল এবং যার ফলে এই বৃহৎ সংস্থাটির বাজারমূল্য ১৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি কমে গিয়েছিল, সেই ধাক্কা কাটিয়ে এখন নিফটি ৫০ সূচকে বছরের সেরা পারফর্মিং স্টক হওয়ার পথে রয়েছে কোম্পানিটি। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত এর শেয়ারের দাম ৩৪% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২০২২ সালের শেষের পর সর্বোচ্চ।

কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার আসল কারণ কী?
দ্য ক্যাপিটাল গ্রুপ, গোল্ডম্যান স্যাক্স এবং এসবিআই ফান্ডস ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের মতো হেভিওয়েট বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনার হিড়িকেই মূলত এই দুর্দান্ত উত্থান ঘটেছে। শর্ট-সেলারদের আক্রমণ, মার্কিন কর্তৃপক্ষের ঘুষের অভিযোগ এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত পেরিয়ে আদানি গ্রুপ ফের বিনিয়োগকারীদের আস্থার জায়গা ফিরে পাচ্ছে। গত জুনে মরগ্যান স্ট্যানলি আদানি এন্টারপ্রাইজেসকে ‘ওভারওয়েট’ রেটিং দেওয়ায় ওয়াল স্ট্রিটের এই ব্যাংকের বিশ্লেষণও নতুন করে নজর কেড়েছে।

বিনিয়োগকারীরা এখন গ্রুপটির বন্দর, বিমানবন্দর এবং বিদ্যুৎ ব্যবসায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করছেন। এমনকি বিদেশি ঋণদাতারাও ক্রমবর্ধমান আগ্রহ দেখাচ্ছেন। हाल ही में গ্রুপটির ডেটা-সেন্টার যৌথ উদ্যোগ ‘আদানিকানেক্স প্রাইভেট লিমিটেড’ তাদের সম্প্রসারণের জন্য প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল ঋণ সুরক্ষিত করেছে।

আদানির ওপর বিনিয়োগকারীদের এই হঠাৎ আস্থার কারণ কী?
ভেন্টুরা সিকিউরিটিজের গবেষণা প্রধান বিনীত বোলিঙ্কার ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছেন যে, আদানি সত্যিই পরিকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে ভারতের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গল্পকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ২০২২ সাল থেকেই তিনি এই ফ্ল্যাগশিপ কোম্পানির জন্য ‘বাই’ রেটিং বজায় রেখেছেন। তাঁর মতে, খুব কম ব্যবসাই আদানির পরিকাঠামো ব্যবসার মতো দীর্ঘমেয়াদী ২০ থেকে ৩০ বছরের ভবিষ্যৎ স্বচ্ছতা দিতে পারে।

গত সপ্তাহে এই প্রত্যাবর্তনের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে একটি বড় খবর। একজন মার্কিন জেলা জজ আদানি পরিবারের বিরুদ্ধে আনা সিকিউরিটিজ জালিয়াতির অভিযোগ স্থায়ীভাবে খারিজ করে দিয়েছেন, যার ফলে ২০২৪ সালের সেই আইনি মামলার চিরতরে অবসান ঘটেছে। পাশাপাশি, এমএসসিআই ইনকর্পোরেটেডের (MSCI) সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় বেশ কয়েকটি আদানি কোম্পানির ফ্রি-ফ্লোট ফ্যাক্টর বৃদ্ধি পাওয়ায় সূচকে তাদের ওয়েটিং বেড়ে গেছে, যা প্যাসিভ ফান্ডগুলোকে শেয়ার কিনতে আরও বেশি উৎসাহিত করছে।

বিদেশি শেয়ারহোল্ডিং এবং আগামীদিনের ঝুঁকি
অবশ্য এই পূর্ণ পুনরুদ্ধারে এখনও কিছুটা সময় লাগবে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, ৪ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের ভারতীয় সংস্থাগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন মাত্র চারটি ব্রোকারেজ সংস্থার আওতাভুক্ত রয়েছে আদানি এন্টারপ্রাইজেস। প্রাইম ইনফোবেসের তথ্য বলছে, গত জুন মাসে সংস্থাটিতে বিদেশি হোল্ডিং রেকর্ড সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছিল। এর প্রধান কারণ বছরের শুরুতে বৈশ্বিক তহবিলগুলোর ভারতীয় শেয়ারে বিনিয়োগ কমানো।

এছাড়া দীর্ঘমেয়াদী কিছু ঝুঁকিও থেকে যাচ্ছে। মরগ্যান স্ট্যানলি তাদের এক নোটে উল্লেখ করেছে যে, বড় পরিকাঠামো প্রকল্প থেকে রিটার্ন আসতে বেশ কয়েক বছর সময় লাগতে পারে, যা আদানিকে পুনঃঅর্থায়ন এবং নিয়ন্ত্রক নীতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

৪ লক্ষ কোটি টাকার বাজার মূলধন বৃদ্ধি
এতকিছুর পরেও, ভারতের পরিকাঠামোর সম্ভাবনায় যারা বাজি ধরতে চান এবং ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত, তাঁদের জন্য আদানি গ্রুপ এক বড় আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছে। এই আগ্রহের ফলেই চলতি বছরে গ্রুপটির শেয়ারের বাজারমূল্য ৪ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গৌতম আদানিকে এশিয়ার শীর্ষ ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় তাঁর স্থান পুনরায় পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করেছে।

দুবাইয়ের আর্কেভিয়াম ক্যাপিটালের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ম্যাক্সেন্স ভিসো জানিয়েছেন যে, ভারতের পরিকাঠামো চক্র দারুণ লাভের সুযোগ তৈরি করে। তবে বর্তমানে আদানির দিকে যে বড় বিনিয়োগকারীরা ফিরে আসছেন, তাঁরা মূলত আইনি জটিলতার অবসান, অর্থায়ন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকল্প সমাপ্তির ওপরই আস্থা রাখছেন। ক্যাপিটাল গ্রুপ, কাতার হোল্ডিং এবং অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠানের ব্লক ট্রেডের মাধ্যমে প্রবেশই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *