রেলস্টেশনের জল কি আদৌ নিরাপদ? জলের কুলারে মারণ ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান মিলায় চাঞ্চল্য CAG রিপোর্টে!

রেলস্টেশনের ভিড়ে ঠাসা প্ল্যাটফর্মে জলের কুলারটি ক্লান্ত যাত্রীদের কাছে কেবল একটি সুবিধা নয়, বরং তৃষ্ণা মেটানোর একমাত্র ভরসা। কিন্তু ভারতের ক্যাগ (CAG)-এর সাম্প্রতিক এক অডিট রিপোর্ট এই নিত্যদিনের আস্থার জায়গাতেই এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে। দেশের কয়েকটি বড় রেললাইনের ওয়াটার কুলারের জল পরীক্ষায় ই. কোলাই (E. coli) ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি মিলেছে। এই ধরনের ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি সাধারণত জলের উৎস বা সরবরাহে মানুষের মল বা বর্জ্য পদার্থের দূষণের ইঙ্গিত দেয়, যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কোন কোন স্টেশনের জলে মিলেছে জীবাণু?
ক্যাগের রিপোর্ট নম্বর ৩১ (২০২৬)-এ যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য ও পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত একাধিক তথ্য উঠে এসেছে। অডিট রিপোর্টে যে আটটি স্টেশনের ওয়াটার কুলারের নমুনায় সমস্যার কথা বলা হয়েছে, সেগুলি হলো:
সাউথেন রেলওয়ে: কোয়েম্বাটুর এবং পালঘাট জংশন।
সাউথ সেন্ট্রাল রেলওয়ে: হায়দ্রাবাদ।
সেন্ট্রাল রেলওয়ে: ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ টার্মিনাস (CSMT), ভিভাণ্ডী রোড, কল্যাণ এবং লোনাভালা।
ইস্টার্ন রেলওয়ে: মধুপুর।
দেশজুড়ে ৫১২টি অ-উপনগরী (non-suburban) স্টেশনে এই অডিট চালানো হয়। ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষ পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এই রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। ফলে বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে এই স্টেশনগুলির জল সরাসরি দূষিত—এমনটা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও, অতীতে যে গুরুতর গাফিলতি ও ত্রুটি ছিল, তা এই রিপোর্টে স্পষ্ট।
ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া কেন বিপজ্জনক?
সাধারণত মানুষ ও প্রাণীর অন্ত্রে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার বাস। এর বেশিরভাগ স্ট্রেনই ক্ষতিকর নয়। তবে পানীয় জলের মধ্যে এর উপস্থিতি একটি বড় বিপদের ঘণ্টা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র মতে, পানীয় জলের কোনো নমুনায় ই. কোলাই বা থার্মোটলারেন্ট কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া থাকা একেবারেই উচিত নয়।
জলে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি মানেই হলো জল সরবরাহ, সংরক্ষণ বা পাইপলাইনের কোথাও মানব বা প্রাণীদেহের বর্জ্যের মাধ্যমে দূষণ ঘটেছে। এর জেরে ডায়রিয়া, মারাত্মক পেটে ব্যথা হতে পারে। এমনকি বিশেষ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে তা কিডনি ফেইলিওরের মতো প্রাণঘাতী রোগের কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নজরদারিতে বড় ফাঁক ও অন্যান্য ঘাটতি
সমস্যা শুধু ওই আটটি স্টেশনের কুলারেই সীমাবদ্ধ নয়। রেলবোর্ডের কড়া নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ৫টি জোনের ৫৬টি স্টেশনে পানীয় জলের কোনো ব্যাকটেরিয়োলজিক্যাল পরীক্ষাই করা হয়নি। এছাড়া অনেক স্টেশনেই জলে ক্লোরিনের পরিমাণ সঠিক মাত্রায় ছিল না। জল উৎসমুখ থেকে বিশুদ্ধ থাকলেও সংরক্ষণের সময়ে বা পাইপলাইনের ত্রুটির কারণে তা যাত্রীদের পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারে।
ক্যাগের এই অডিটে আরও জানা গেছে যে, পরীক্ষিত ৫১২টি স্টেশনের মধ্যে ৪৫৮টিতেই (প্রায় ৮৯ শতাংশ) ন্যূনতম জরুরি সুবিধার বড় ঘাটতি রয়েছে। পানীয় জল, বসার জায়গা, শৌচাগার, প্ল্যাটফর্মের শেড থেকে শুরু করে ফ্যান ও সাইনেজের মতো মৌলিক পরিষেবাগুলিতেও ব্যাপক অনিয়ম চোখে পড়েছে।
রেলের পরবর্তী পদক্ষেপ: ‘ট্যাংক টু ট্যাপ’ ব্যবস্থা
পরিস্থিতি গুরুতর বুঝে নড়েচড়ে বসেছে রেল মন্ত্রক। ওয়াটার কুলারসহ প্রায় ২০,০০০ পয়েন্টে নতুন করে ‘ট্যাংক টু ট্যাপ’ (Tank to tap) জল ফিল্টারেশন ও মনিটরিং সিস্টেম বসানোর পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল ফিল্টার বসালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত অণুজীব পরীক্ষা (microbiological testing), নিয়মিত জলের ট্যাঙ্ক পরিষ্কার রাখা এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে পরীক্ষার ফলাফল জনসমক্ষে আনা। যাত্রীদের জন্যও বার্তাটি স্পষ্ট—চোখে দেখতে পরিষ্কার লাগলেই সেই জল নিরাপদ নয়। রেলের কাছেও এটি এখন কেবল কোনো সাধারণ পরিষেবা নয়, বরং সরাসরি জনস্বাস্থ্যের দায়িত্ব হিসেবে দেখার সময় এসে গেছে।