“ব্রিটিশদের ভারত ছাড়বই!” ১০ বছর বয়সে দেশ স্বাধীন করার পণ নেওয়া হাওড়ার গুণধরের অজানা কাহিনী

সময়টা উত্তাল। ঘরে ঘরে বাজছে স্বাধীনতার রণডঙ্কা। বাচ্চা থেকে বুড়ো— ব্রিটিশ শৃঙ্খল ভাঙার মন্ত্র জপ করে চলেছেন দিন-রাত। তেমনই একটি রাতে হাওড়ার প্রত্যন্ত এলাকার একটি গলিতে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। বগলে একতোড়া পোস্টার নিয়ে এক বছর দশেকের কিশোর একটার পর একটা দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। একটি পোস্টার সাঁটিয়ে ফের সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। কয়েক মুহূর্ত পরেই গলির সামনেটা এসে পড়ল একটি জিপের জোরালো হলুদ আলো। বুটের খটখট শব্দে পাড়ার নিস্তব্ধতা ভেঙে চুরমার।

এক হাবিলদার টর্চের আলোটা ফেলল সোজা ওই কিশোরের মুখে। পাশ থেকে এক ব্রিটিশ অফিসার কর্কশ শব্দে চিৎকার করলেন, ‘হে ইয়ং বয়, তুমি কে? এখানে কী করিতেছ?’ গা-হাত, পা ততক্ষণে অবশ হয়ে গিয়েছে কিশোরের। ভয়কে চেপে রেখেই ছেলেটি আলতো গলায় বলল, ‘পোস্টার মারছি…’। ততক্ষণে ওই অফিসার এসে কিশোরের কানটা টেনে ধরেছেন। রাগে গোটা শরীর জ্বলে গিয়েছিল সেই কিশোরের। মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল, ‘ব্রিটিশদের ভারত ছাড়া করবই।’

আজ স্বাধীনতার ৮০ বছর পরে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সেই জীবন্ত দলিল গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায় বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরলেন তাঁর সেই সংগ্রামী শৈশবের কথা।

ছোট থেকেই দেশাত্মবোধের দীক্ষা

হাওড়ার আমতা এলাকায় আদি বাড়ি হলেও বর্তমানে তিনি হুগলির বলাগ্টে থাকেন। গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাবা জয়কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর ভাই বিজয়কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় দুজনেই যুক্ত ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনে। জেঠতুতো দাদা ঘনশ্যামের হাত ধরেই মূলত স্বদেশী আন্দোলনে পা রাখেন গুণধর। মাত্র ১০ বছর বয়স থেকে পাঠশালায় পড়ার সময়েই তিনি বিপ্লবীদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি শুরু করেন। রাতের অন্ধকারে দোকানে ও সরকারি অফিসে ‘হরতাল’ লেখা পোস্টার টাঙিয়ে আসতেন তিনি। একবার সরকারি অফিসে পোস্টার লাগানোর অপরাধে ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে ৬ টাকা ২৫ পয়সা জরিমানাও করেছিল।

দাদা ঘনশ্যামের মাধ্যমেই বৃন্দাবন চট্টোপাধ্যায়, প্রফুল্ল সেন, অজয় মুখোপাধ্যায়, ভূপতি মজুমদার, অতুল্য ঘোষের মতো মহান নেতাদের সান্নিধ্যে আসেন তিনি। এমনকি মহাত্মা গান্ধী যখন নোয়াখালি যাওয়ার পথে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বজবজে আসেন, তখন তাঁকে সামনে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল গুণধরের।

স্বাধীনতার পরবর্তী জীবন ও জীবনাদর্শ

স্বাধীনতার পর কংগ্রেসের রাজনীতিতে যুক্ত হন গুণধরবাবু। ১৯৬৪ সালে মহিপালপুর পঞ্চায়েতের উপপ্রধান নির্বাচিত হন এবং ১৯৭০-৭১ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত একই পঞ্চায়েতের প্রধান হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। উপপ্রধান থাকাকালীন গ্রামের উন্নয়ন ও আলোচনার জন্য তিনি ‘গান্ধী ঘর’ তৈরি করেছিলেন।

জীবনে কোনোদিন ফুলপ্যান্ট পরেননি তিনি। আজও পরেন সাদা খদ্দরের ধুতি ও পাঞ্জাবি— যা মহাত্মা গান্ধীর আদর্শের প্রতি তাঁর আজীবন শ্রদ্ধার নিদর্শন। দেশ গড়ার কাজে অবদানের জন্য অগ্রজ বিপ্লবী প্রফুল্ল সেন ও শান্তিমোহন রায়ের কাছ থেকে পাওয়া ‘রক্তরাঙা’ মেডেল আজও তিনি সযত্নে রক্ষা করে চলেছেন।

আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল অতীতের দিনগুলি

বর্তমানে ৯৩ বছর বয়সি গুণধরবাবুর শরীরের চামড়া কুঁচকেছে, চুলে পাক ধরেছে এবং শ্রবণশক্তি কিছুটা হ্রাস পেলেও মনের জোর এক ফোঁটাও কমেনি। তাঁর কাঁপা কাঁপা গলায় আজও জীবন্ত হয়ে ওঠে সেই সংগ্রামী দিনগুলির স্মৃতি। ছোট ছেলে মাধব বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, তাঁদের পরিবারের সকলেই গান্ধীজির স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। বলাগড়ের আঞ্চলিক গবেষক তথা অধ্যাপক পার্থ চট্টোপাধ্যায়ও একমত যে, ছাত্রাবস্থা থেকেই স্বাধীনতা আন্দোলনে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন এই লড়াকু মানুষটি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *