১৯৪৭-এও স্বাধীন হয়নি ভারতের যে রাজ্য? স্বাধীনতার ১৪ বছর পর পায় মুক্তির স্বাদ

১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পেয়েছিল ভারত। স্বাধীনতার আনন্দে যখন গোটা দেশ মাতোয়ারা, তখন সৈকত শহর গোয়ায় কিন্তু এক ফোঁটাও ওড়েনি স্বাধীনতার তেরঙ্গা পতাকা। কারণ, ব্রিটিশরা আসার বহু আগেই সেখানে রাজত্ব শুরু করেছিল পর্তুগিজরা। ভারতের মধ্যে গোয়াই একমাত্র অঞ্চল, যা ব্রিটিশ রাজের অধীনে কোনো দিন আসেনি। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হলেও গোয়া পর্তুগিজ শাসন থেকে মুক্ত হতে সময় নিয়েছিল আরও ১৪ বছর। দীর্ঘ ৪৫১ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৬১ সালের ডিসেম্বরে এক নজিরবিহীন সামরিক অভিযানের মাধ্যমেই স্বাধীন ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে গোয়া।
ব্রিটিশদের আগমনের বহু আগের ঔপনিবেশিক ইতিহাস
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে পা রাখার অনেক আগেই গোয়ায় শুরু হয়েছিল পর্তুগিজদের শাসন। ১৫১০ সালে পর্তুগিজ অ্যাডমিরাল আফনসো ডি আলবুকার্ক, বিজাপুরের সুলতান ইউসুফ আদিল শাহকে পরাজিত করে এই অঞ্চলের দখল নেন। এর পর থেকেই গোয়া হয়ে ওঠে দক্ষিণ এশিয়ায় পর্তুগাল সাম্রাজ্যের মূল কেন্দ্র ও রাজধানী। নেপোলিয়নের যুদ্ধের সময়ে কিছুদিনের জন্য ব্রিটিশ বাহিনী সাময়িক ভাবে গোয়ায় অবস্থান করলেও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি পর্তুগিজদের হাতেই ছিল। ফলস্বরূপ, ১৫১০ সাল থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত গোয়ায় শাসকের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
ভারতের স্বাধীনতা ও গোয়ার বন্দিদশা
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরেও গোয়া থেকে যায় পর্তুগিজদের দখলেই। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু শান্তিপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমে গোয়াকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চালালেও, পর্তুগালের একনায়কতান্ত্রিক সরকার সেই প্রস্তাব সরাসরি খারিজ করে দেয়। এর পরেই গোয়ার অভ্যন্তরে তীব্র আন্দোলনের সূচনা হয়। ১৯২৮ সালে ‘গোয়া ন্যাশনাল কংগ্রেস’ গঠিত হয় এবং ১৯৪৬ সালে সমাজতান্ত্রিক নেতা রামমনোহর লোহিয়া এক ঐতিহাসিক সমাবেশের মাধ্যমে গোয়ার নাগরিক অধিকার ও ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জোরালো দাবি তোলেন।
সশস্ত্র সংগ্রাম এবং ‘অপারেশন বিজয়’
সত্যাগ্রহীদের পাশাপাশি ‘আজ়াদ গোমন্তক দল’ ও ‘ইউনাইটেড ফ্রন্ট অফ গোয়ানস’-এর মতো একাধিক সংগঠন পর্তুগিজ প্রশাসনের বিরুদ্ধে গেরিলা আক্রমণ শুরু করে। পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায় ১৯৬১ সালের ২৪ নভেম্বর, যখন পর্তুগিজ বাহিনী একটি ভারতীয় যাত্রিবাহী জাহাজে নির্বিচারে গুলি চালায়। ফলস্বরূপ এক যাত্রীর মৃত্যু হয় এবং বহু মানুষ জখম হন।
এই ঘটনার পরেই সংসদে সামরিক পদক্ষেপের জোরালো দাবি ওঠে। অবশেষে ১৯৬১ সালের ১৭-১৮ ডিসেম্বরের মধ্যরাতে স্থল, জল ও বিমানবাহিনীকে নিয়ে যৌথভাবে ‘অপারেশন বিজয়’ শুরু করে ভারত। প্রায় ৩০ হাজার ভারতীয় জওয়ান, যুদ্ধজাহাজ এবং বিমানবাহিনীর সাঁড়াশি আক্রমণে মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে পর্তুগিজ প্রতিরোধ ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়।
অবশেষে ১৯৬১ সালের ১৯ ডিসেম্বর রাত সাড়ে আটটায় গভর্নর-জেনারেল ম্যানুয়েল আন্তোনিও ভাসালো ই সিলভা আত্মসমর্পণের দলিলে সই করেন। এর মাধ্যমেই গোয়ায় অবসান ঘটে ৪৫১ বছরের পর্তুগিজ শাসনের। প্রতি বছর ১৯ ডিসেম্বর দিনটি ‘গোয়া মুক্তি দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। প্রথমে দমন ও দিউয়ের সঙ্গে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে যুক্ত হলেও, পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালের ৩০ মে গোয়া ভারতের পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা লাভ করে।