LIC পলিসি কি মাঝপথেই ভেঙে ফেলার কথা ভাবছেন? এই ভুল করলেই কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের বিশাল অংশ চিরতরে হারাবেন!

জীবন বীমা কেবল একটি সাধারণ বিনিয়োগ নয়, এটি আমাদের এবং আমাদের পরিবারের আর্থিক ভবিষ্যতের সুরক্ষার অন্যতম বড় ভরসা। তবে জীবনের নানা চড়াই-উতরাই ও আর্থিক সঙ্কটের জেরে অনেক সময় প্রতি মাসে বা বছরে নিয়মিত পলিসির প্রিমিয়াম দেওয়া অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে।

এমন পরিস্থিতিতে বহু পলিসিগ্রাহকই ম্যাচিউরিটি বা মেয়াদ পূর্তির আগেই পলিসি বন্ধ করে দেওয়া বা ‘সারেন্ডার’ করার কথা চিন্তা করেন। আপনিও যদি ভারতীয় জীবন বীমা নিগম (LIC) বা অন্য কোনো সংস্থার পলিসি মাঝপথে বন্ধ করার কথা ভেবে থাকেন, তবে তাড়াহুড়ো না করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্পূর্ণ বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখুন। কারণ, পলিসি সারেন্ডার করলে শুধু যে আপনার ও পরিবারের জীবন বীমার সুরক্ষা কবচ চলে যায় তাই নয়, কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের এক বিশাল অংশও আপনি চিরতরে হারাতে পারেন।

পলিসি সারেন্ডার আসলে কী এবং এর পরিণতি কী?

বীমার ভাষায়, নির্দিষ্ট মেয়াদের আগে পলিসি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দিয়ে জমা টাকা ফেরতের আবেদন জানানোকেই ‘পলিসি সারেন্ডার’ বলা হয়। অধিকাংশ মানুষেরই ভুল ধারণা থাকে যে, তাঁরা এতদিন ধরে প্রিমিয়াম বাবদ যত টাকা জমা দিয়েছেন, তার পুরোটাই ফেরত পাবেন। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পলিসি বন্ধ করলে সংস্থা গ্রাহককে যে অর্থ ফেরত দেয়, তাকে বলা হয় ‘সারেন্ডার ভ্যালু’ (Surrender Value)। পলিসির শর্তাবলীতে সারেন্ডার চার্জ এবং অন্যান্য কাটোতির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে, যা অনেকেই না পড়ে এড়িয়ে যান। ফলে চরম প্রয়োজনের দিনে টাকা তুলতে গিয়ে দেখা যায়, জমার তুলনায় প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ অত্যন্ত কম।

শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, পলিসি সারেন্ডার করার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো জীবন বীমার নিরাপত্তা চিরতরে শেষ হয়ে যাওয়া। সারেন্ডার করার সঙ্গে সঙ্গেই আপনার লাইফ কভারেজ বা বীমা সুরক্ষা তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল হয়ে যায়। ফলে ভবিষ্যতে বীমাগ্রহীতার সঙ্গে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটলে, তাঁর পরিবার বা নমিনি আর কোনো ‘ডেথ বেনিফিট’ পাবেন না। বিশেষ করে টার্ম ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রে এই ক্ষতি আরও মারাত্মক, কারণ এতে কোনো সঞ্চয় বা সারেন্ডার ভ্যালুর সুবিধা থাকে না—মাঝপথে প্রিমিয়াম বন্ধ করলে কভারেজ এবং জমা টাকা—দুটিই সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে যায়।

কেন জমানো টাকার একটি বড় অংশ কেটে নেওয়া হয়?

বীমা ব্যবস্থার একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক কাঠামো রয়েছে। পলিসির শুরুর প্রথম কয়েক বছরে গ্রাহকের প্রিমিয়ামের একটি বড় অংশ এজেন্টের কমিশন, প্রশাসনিক খরচ এবং ‘আন্ডাররাইটিং চার্জ’ মেটাতে চলে যায়। ফলে প্রথম ২ থেকে ৪ বছরের মধ্যে পলিসি বন্ধ করলেই সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়। এছাড়া এন্ডোমেন্ট বা মানি-ব্যাক পলিসিতে যে বোনাস ও ‘লয়্যালটি অ্যাডিশন’ জমা হয়, পলিসি সারেন্ডার করলে সেই সমস্ত অতিরিক্ত সুবিধাও এক নিমেষে বাতিল হয়ে যায়।

সারেন্ডার না করে কী বিকল্প বেছে নেওয়া উচিত?

হঠাৎ আর্থিক সঙ্কটে প্রিমিয়াম দেওয়া অসম্ভব হয়ে উঠলে পলিসি সারেন্ডার করাই একমাত্র পথ নয়। এর পরিবর্তে আপনি চাইলে আপনার পলিসিটিকে ‘পেইড-আপ’ (Paid-up) করে নিতে পারেন। এটি একটি অত্যন্ত বুদ্ধিমানের বিকল্প। এতে আপনাকে আর নতুন করে কোনো প্রিমিয়াম দিতে হবে না, অথচ পলিসিটি পুরোপুরি বন্ধও হবে না। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কম ‘সাম অ্যাসুরেন্স’ বা বীমা রাশি নিয়ে মেয়াদ পূর্তি পর্যন্ত পলিসিটি চালু থাকবে। এর ফলে বীমার সুবিধা কিছুটা হ্রাস পেলেও, আপনার পরিবারের আর্থিক সুরক্ষা সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাবে না।

পাশাপাশি, বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘আইআরডিএআই’ (IRDAI) সাম্প্রতিক কিছু নিয়মে পরিবর্তন এনেছে, যার ফলে কিছু ক্ষেত্রে আগের তুলনায় কিছুটা ভালো সারেন্ডার ভ্যালু পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই চরম কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনার বীমা প্রদানকারী সংস্থার থেকে ‘সারেন্ডার ভ্যালু’ এবং ‘পেইড-আপ ভ্যালু’—উভয়েরই হিসাব বিস্তারিতভাবে চেয়ে নিয়ে তুলনা করে তবেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *