বর্ধমান রেনেসাঁ টাউনশিপ কাণ্ড: পাকিস্তানি গুপ্তচরবৃত্তি মামলায় তিন অভিযুক্তের ২৮ দিনের জেল হেফাজত

বর্ধমানের রেনেসাঁ টাউনশিপ-কাণ্ডে পাকিস্তানি যোগ এবং চাঞ্চল্যকর গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেফতার তিন অভিযুক্তকে ফের জেল হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিল বর্ধমান আদালত। শুক্রবার এসটিএফের হেফাজতের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মহম্মদ হামিম মণ্ডল, অর্পিতা সরকার এবং আদিত্য সিং ওরফে রাজকে আদালতে পেশ করা হয়। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক তিনজনেরই ২৮ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন। আগামী ১১ সেপ্টেম্বর তাঁদের ফের আদালতে হাজির করানো হবে।
গ্রেফতারির নেপথ্য কাহিনি
এই মামলার সূত্রপাত হয় বর্ধমানের রেনেসাঁ টাউনশিপ থেকে মহম্মদ হামিম মণ্ডলের গ্রেফতারির মাধ্যমে। তাঁর মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস পরীক্ষা করার পর তদন্তকারীদের হাতে আসে একাধিক চাঞ্চল্যকর যোগাযোগের সূত্র। সেই সূত্র ধরেই সামনে আসে হামিমের বাগদত্তা অর্পিতা সরকারের নাম। এরপর ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জে অভিযান চালিয়ে এসটিএফ তাঁকে গ্রেফতার করে। তদন্তকারীদের দাবি, পাকিস্তানি হ্যান্ডলারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার এবং হানি ট্র্যাপের মাধ্যমে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন অর্পিতা।
তৃতীয় অভিযুক্তের ভূমিকা ঘিরে ধোঁয়াশা
এই মামলায় তৃতীয় গ্রেফতার হওয়া আদিত্য সিংকে নিয়েও জোরদার তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ। বর্ধমানের বেলিলিয়া রোডের বাসিন্দা এই কলেজ পড়ুয়ার সঙ্গে পাকিস্তানি হ্যান্ডলারদের যোগাযোগের কিছু সূত্র ইতিমধ্যেই তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। তবে হামিম বা অর্পিতার সঙ্গে তাঁর ঠিক কী ধরনের যোগ ছিল কিংবা এই সিন্ডিকেটে তাঁর সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কী, তা এখনও স্পষ্ট নয়। আদিত্যর মোবাইল এবং অন্যান্য ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যমগুলি নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পাক হ্যান্ডলার ও এনক্রিপ্টেড চ্যাটের জাল
এসটিএফ সূত্রে জানা গিয়েছে, হামিমের সঙ্গে বিদেশি হ্যান্ডলারদের যোগাযোগের অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। তদন্তে রানা, উজাইর, আবিদ জাট এবং হামিদ-সহ একাধিক সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষ করে ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, ডিসকর্ড এবং Element X-এর মতো সুরক্ষিত প্ল্যাটফর্মে কথাবার্তা চলত বলে অভিযোগ। এই যোগাযোগের সূত্র ধরেই পুরো পাকিস্তান-ভিত্তিক নেটওয়ার্কের জাল কতদূর বিস্তৃত, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থা।
আইনি লড়াই ও কেন্দ্রীয় সংস্থার নজরদারি
এদিন আদালতে হামিমের পরিবারের পক্ষে সওয়াল করেন আইনজীবী কমল দত্ত। তিনি জানান, সম্প্রতি তিনি এই মামলার আইনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আদালতের সমস্ত নথি হাতে পাওয়ার পর হামিমের বিরুদ্ধে আনা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং বাকি অভিযুক্তদের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র পরিষ্কার হবে। এই মামলায় কঠোর UAPA-সহ একাধিক গুরুতর আইন প্রয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি, রাজ্য এসটিএফের পাশাপাশি এই তদন্তে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা এনআইএ-ও যুক্ত রয়েছে বলে আদালত চত্বরে জানান তিনি।
পরবর্তী পদক্ষেপ ও ফরেন্সিক পরীক্ষা
বর্তমানে তদন্তকারীদের মূল ফোকাস রয়েছে তিন অভিযুক্তের ডিজিটাল ডিভাইস, চ্যাট হিস্ট্রি, আর্থিক লেনদেন এবং ডিজিটাল ওয়ালেটের ওপর। মোবাইল বা কম্পিউটার থেকে মুছে ফেলা বার্তা এবং বিদেশি যোগাযোগের সমস্ত তথ্য উদ্ধারের জন্য জোরকদমে ফরেন্সিক পরীক্ষা চলছে। তদন্তকারীদের জোরালো অনুমান, এই ডিজিটাল তথ্যগুলি সম্পূর্ণ উদ্ধার করা সম্ভব হলে পাকিস্তানি হ্যান্ডলারদের আসল ভূমিকা, হানি ট্র্যাপের মডিউল এবং এই গুপ্তচর চক্রে আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না, সেই রহস্য পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে যাবে।