প্রতিবাদ করার অধিকার কে আটকাবে? নালসার কাণ্ডে বার কাউন্সিলকে তুলোধনা প্রধান বিচারপতির!

একান্তই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া এবং প্রধান বিচারপতির বিষয়। সেখানে হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার (BCI) নেই। নালসার বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ ব্যাচের পড়ুয়াদের আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্তি নিয়ে তৈরি হওয়া তীব্র বিতর্কে শুক্রবার ঠিক এই বার্তাই স্পষ্ট করে দিল সুপ্রিম কোর্ট। বিসিআই-এর বিতর্কিত নির্দেশে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “ছাত্রদের প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে। কে তাদের আটকাবে? এটা ছাত্রদের সঙ্গে আমার কথোপকথন। বিসিআই এখানে হস্তক্ষেপ করবে কেন?”

নালসার ইউনিভার্সিটি অফ ল-এর ২০২৬ ব্যাচের স্নাতকদের আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্তি আটকে দেওয়ার জন্য বৃহস্পতিবার একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল বিসিআই। দেশের সমস্ত স্টেট বার কাউন্সিলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ ব্যাচের কোনো পড়ুয়াকে অ্যাডভোকেট হিসাবে নথিভুক্ত করা যাবে না। আর এই নির্দেশ ঘিরেই আইনি মহলে তীব্র বিতর্ক দানা বাঁধে।

সেই বিতর্কিত বিজ্ঞপ্তিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করা হয়। শুক্রবার জরুরি ভিত্তিতে মামলাটি শুনানির জন্য উল্লেখ করা হলে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত কড়া অবস্থান নেয়। উল্লেখ্য, এই বেঞ্চে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনা।

শুনানিতে প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করে দেন, পড়ুয়াদের প্রতিবাদ বা মতপ্রকাশের মতো বিষয়ে বিসিআই-এর এই ধরনের অযাচিত হস্তক্ষেপ আদালত মোটেই ভালো চোখে দেখছে না। তাঁর প্রশ্ন ছিল, “ওদের প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে। কে আটকাবে?” এর পরেই সুর আরও চড়িয়ে প্রধান বিচারপতির মন্তব্য করেন, “এটা ছাত্রদের সঙ্গে আমার কথোপকথন। বিসিআই এখানে হস্তক্ষেপ করবে কেন?”

শুধু তাই নয়, বিসিআই বা কোনো রাজ্য বার কাউন্সিলের তরফে নালসারের কোনো পড়ুয়া কিংবা শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো রকম শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করা যাবে না বলেও স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত। ফলে আপাতত ওই পড়ুয়াদের আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্তির পথে সমস্ত আইনি বাধা কেটে গেল। শুনানির সময় বিসিআই-এর আইনজীবী আদালতকে জানান যে বিতর্কিত সেই বিজ্ঞপ্তি ইতিমধ্যেই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। এর পর মামলাটি আগামী দু’সপ্তাহ পরে শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করেছে শীর্ষ আদালত।

পুরো ঘটনার নেপথ্যে কী?

ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল নালসার বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের ওই সমাবর্তনে অংশগ্রহণ নিয়ে পড়ুয়াদের একাংশের আপত্তি বা প্রতিবাদের অভিযোগ ওঠে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই বিষয়টি খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিসিআই। বিসিআই-এর চেয়ারম্যান মানন কুমার মিশ্র জানান, কারা ওই প্রচারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের চিহ্নিত করে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে।

প্রাথমিক নির্দেশে বলা হয়েছিল, ২০২৬ সালের নালসার স্নাতকদের আইনজীবী হিসাবে নথিভুক্তি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। এমনকি ১৯ আগস্ট অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র খতিয়ে দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছিল।

কিন্তু নির্দেশ প্রকাশের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চারদিক থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। এমনকি সমাজমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। চাপের মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত বিসিআই নিজেদের অবস্থান সংশোধন করে নতুন বিজ্ঞপ্তি জারি করে। সেখানে জানানো হয়, নালসারের ‘বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ’ পড়ুয়া কোনো অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত নন। মাত্র কয়েক জনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জন্য সমগ্র ব্যাচকে শাস্তি দেওয়া উচিত নয়। তাই ২০২৬ ব্যাচের পড়ুয়াদের আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্তির অনুমতি দেওয়া হয়।

অবশ্য বিসিআই নিজেদের অবস্থান সংশোধন করলেও আদালতের অন্দরে অসন্তোষের পারদ কমেনি। পড়ুয়াদের গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিবাদ করার অধিকার এবং তাঁদের সঙ্গে আদালতের নিজস্ব সংলাপে বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠানের হস্তক্ষেপের প্রশ্নটি যে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে শীর্ষ আদালত, প্রধান বিচারপতির কড়া মন্তব্যে তা ফের স্পষ্ট হয়ে গেল। এখন আগামী দু’সপ্তাহ পরে মামলার পরবর্তী শুনানিতে আদালত কী নির্দেশ দেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা দেশের আইনজীবী মহল। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, নালসার-কাণ্ডে বার কাউন্সিলের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে আগামী দিনে আরও কড়া ব্যাখ্যা তলব করা হতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *