চিকেনস নেকের সুরক্ষায় বড় ঝাঁকুনি! ২২ আগস্ট শিলিগুড়িতে আসছেন অমিত শাহ, থাকতে পারেন মুখ্যমন্ত্রীও

উত্তর-পূর্ব ভারতকে বাকি দেশের সঙ্গে জুড়ে রাখা দেশের অত্যন্ত সংবেদনশীল কৌশলগত করিডর ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দিল্লির অন্দরে। আর এই পরিস্থিতিতে সার্বিক পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে আগামী ২২ আগস্ট শিলিগুড়িতে সফরে আসতে চলেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সূত্রের খবর, শিলিগুড়ির নৌকাঘাট সংলগ্ন কাওয়াখালি মাঠে একটি সচেতনতা শিবিরে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি, এই গুরুত্বপূর্ণ সফরে তাঁর সঙ্গে থাকতে পারেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও।
নেপাল সীমান্তে আইএসআই-র বাড়বাড়ন্ত
গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০-র দশকের শেষ দিক থেকেই পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই ভারত-বিরোধী কার্যকলাপ পরিচালনার জন্য নেপালকে নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ভারত-নেপাল খোলা সীমান্ত, নেপালের উদার ভিসা নীতি এবং কাঠমান্ডু বিমানবন্দরসহ একাধিক চেকপোস্টের আলগা অভিবাসন ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে এই নাশকতামূলক ছক কষা হচ্ছে বলে বারবার অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, সুকৌশলে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ভারত-লাগোয়া নেপালি ভূখণ্ডে জনবিন্যাস পাল্টে জঙ্গি ঘাঁটি বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে আইএসআই, যার জেরে সম্প্রতি নতুন করে অশান্ত হয়ে উঠেছে নেপাল।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে চিনা নজরদারি
অন্যদিকে, উত্তর-পূর্বের এই করিডরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ সীমান্ত পরিস্থিতিও। গোয়েন্দাদের দাবি, প্রযুক্তিগত সহায়তার আড়ালে বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন পরিকাঠামোয় ঢুকে পড়ে ‘চিকেনস নেক’ এলাকায় নিজেদের নজরদারি এবং দৌরাত্ম্য বাড়িয়ে চলেছে চিন। গালওয়ান বা ডোকলাম সংঘাতের স্মৃতি এখনও টাটকা। বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় থাকলেও, বিশেষ করে অরুণাচল সীমান্ত নিয়ে সাম্প্রতিক টানাপড়েনের পর ভারতের নিরাপত্তা এজেন্সির কাছে চিন এক অন্যতম বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, ভারতের অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি ও অগ্রগতিকে স্তব্ধ করতে উত্তর-পূর্ব সিকিম ও বাংলাদেশ সীমান্তকে ব্যবহার করে বড় ধরণের চাপ বাড়াতে পারে বেজিং, যেখানে তাদের মূল নিশানায় রয়েছে এই শিলিগুড়ি করিডরই।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই ‘চিকেনস নেক’?
একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম: শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’ ভারতের জন্য কৌশলগত, সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল দেশের একমাত্র স্থলপথ। এই করিডর সুরক্ষিত না থাকলে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলির সঙ্গে দিল্লির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
চারটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত: এই করিডরের চারপাশে রয়েছে নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ এবং চিন (তিব্বত), যা ভৌগোলিক দিক থেকে এটিকে আরও বেশি স্পর্শকাতর করে তুলেছে।
যোগাযোগ ও শক্তির উৎস: দেশের সমস্ত প্রধান সড়কপথ, রেলপথ, তেল ও গ্যাস পাইপলাইন এবং জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড এই সংকীর্ণ করিডরের ভেতর দিয়েই উত্তর-পূর্ব ভারতে প্রবেশ করেছে।
বাণিজ্যিক করিডর: ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ (Act East) নীতির আওতায় মিয়ানমার, থাইল্যান্ড এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য প্রসারের ক্ষেত্রেও এই করিডরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সবমিলিয়ে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরক্ষা ও অখণ্ডতা বজায় রাখতে শিলিগুড়ির এই করিডরকে ঘিরে কেন্দ্রের শীর্ষ নেতৃত্ব এখন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই শিলিগুড়ি সফর তাই বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহল।