‘১৫ কিমি ঘুরে কী করে পড়ব?’ বাধ্য হয়ে ৪ ফুটের পিলার লাফিয়ে স্কুল পারাপার! মধ্যপ্রদেশের এই ছবি দেখলে চোখ কপালে উঠবে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশের একটি ভিডিও ঝড়ের বেগে ভাইরাল হয়েছে, যেখানে দেখা গেছে বেশ কিছু শিশু চরম জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্থানীয় একটি বাঁধের এক পিলার থেকে অন্য পিলারে লাফিয়ে নদী পার হয়ে স্কুলে যাচ্ছে। ঘটনার গভীরে যেতে বিদিশা জেলার পালোহ গ্রামে পৌঁছায় সংবাদমাধ্যমের টিম। স্থানীয় বাসিন্দা ও পড়ুয়াদের সঙ্গে কথা বলে উঠে আসে এক মর্মান্তিক চিত্র—এটি একদিনের ঘটনা নয়, বরং বিগত সাত-আট বছর ধরে এভাবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্লাসে পৌঁছাতে বাধ্য হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা।

‘প্রায় চার ফুট লাফাতে হতো’
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যাওয়া একাদশ শ্রেণির ছাত্র দেব শর্মা ও দশম শ্রেণির কেশব গুর্জরের কথায় উঠে এসেছে নির্মম সত্য। কেশব জানিয়েছে, রাস্তা দিয়ে স্কুলে গেলে তাদের অতিরিক্ত ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতো, যা সাইকেলে যাতায়াত করা অসম্ভব। তাই সময় বাঁচাতে বাধ্য হয়েই তারা পিলারের উপর দিয়ে লাফিয়ে যাতায়াত করে। পালোহতে হাইস্কুল না থাকায় এবং শহরের স্কুলগুলোতে পৌঁছাতে রেললাইন ও হাইওয়ে পার হতে হওয়ার কারণে গরিব অভিভাবকরা সন্তানদের এই বিপজ্জনক পথেই পাঠাতে বাধ্য হন। রিচা গিরি গোস্বামী নামে আরেক পড়ুয়া জানায়, তার বড় ভাই-বোনদের প্রজন্মও একইভাবে এই ঝুঁকি নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে।

প্রশাসনের টনক নড়ল দেরিতে
ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসতেই স্থানীয় প্রশাসন, রাজ্য সরকার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নড়েচড়ে বসেছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গত ৭ই আগস্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মধ্যপ্রদেশ সরকারকে নোটিশ জারি করে দুই সপ্তাহের মধ্যে বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করেছে। পাশাপাশি, মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টও প্রশাসনের পরিদর্শন প্রতিবেদন তলব করে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কড়া নির্দেশ দিয়েছে। চাপের মুখে পড়ে স্থানীয় প্রশাসন বাঁধের স্তম্ভের উপরে লোহার পাটাতন বসানোর কাজ করেছে এবং পালোহ গ্রামেই নবম ও দশম শ্রেণির পঠন-পাঠন চালুর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পড়ুয়াদের স্থানীয় হাইস্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করেছে।

শুধু পালোহ নয়, গোটা রাজ্যের চিত্রটাই উদ্বেগজনক
মধ্যপ্রদেশের শুধু বিদিশা নয়, শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশা রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলেও স্পষ্ট। বিদিশা থেকে ১২০ কিমি দূরে সাগর জেলার বেলখড়ি কালান গ্রামে বর্ষার সময়ে শিশুদের একে অপরের হাত ধরে কোমর সমান জল পেরিয়ে স্কুলে যেতে হয়। অন্যদিকে, মাণ্ডলা জেলার সিংহানপুরী পঞ্চায়েতে স্থায়ী স্কুলঘর না থাকায় গত পাঁচ বছর ধরে গবাদি পশুর গোয়াল ঘরেই ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ক্লাস চলছে। বহুবার আবেদন করেও প্রতিকার মেলেনি বলে অভিযোগ গ্রামপ্রধানের।

বাজেট বরাদ্দ বনাম বাস্তব চিত্র
মধ্যপ্রদেশ সরকার চলতি বাজেটে স্কুল শিক্ষা বিভাগের জন্য ৪৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ করার ঘোষণা দিলেও, সিএজি (CAG)-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে সরকারি স্কুলগুলোর চরম বেহাল দশা ও অবকাঠামোগত সংকটের চিত্রই ফুটে উঠেছে। রাজ্যের হাজার হাজার স্কুল জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে, যেখানে বিদ্যুৎ ও শৌচাগারের মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধারও তীব্র অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে লক্ষাধিক শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষাজীবন আজ এক গভীর সংকটের মুখে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *