সকালে নাকি বিকেলে, কখন হাঁটলে বেশি উপকার? ওজন কমানো থেকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে হাঁটার সঠিক সময় ও নিয়ম

হাঁটা এমন একটি সহজ এবং জাদুকরী শারীরিক কার্যকলাপ, যা প্রায় সব বয়সী মানুষ খুব সহজেই দৈনন্দিন রুটিনে যুক্ত করতে পারেন। নিয়মিত হাঁটা শরীরকে সক্রিয় রাখার পাশাপাশি হৃদ্‌স্বাস্থ্য ভালো রাখতে, রক্তচাপ ও রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে এবং সামগ্রিক সুস্থতায় দারুণ ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। কিন্তু অনেকেরই মনে চিরন্তন একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে—সকালে হাঁটা ভালো, নাকি বিকেলে? ওজন কমাতে খালি পেটে হাঁটা কি বেশি কার্যকর? আবার ডায়াবেটিস থাকলে কি খাবারের পর হাঁটা উচিত?

আসলে হাঁটার জন্য সবার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো ‘সেরা সময়’ বলে কিছু নেই। আপনার জীবনযাত্রার সঙ্গে যে সময়টি সবচেয়ে ভালোভাবে মানানসই এবং আপনি যেটি নিয়মিত মেনে চলতে পারবেন, সেটাই আপনার জন্য সবচেয়ে উপযোগী। তবে দিনের বিভিন্ন সময়ে হাঁটার রয়েছে কিছু আলাদা বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যগত সুবিধা।

১. সকালে হাঁটার বিশেষ সুবিধা
সকালের হাঁটা দিনের শুরুতেই শরীর ও মনকে চনমনে করে তুলতে সাহায্য করে।

অভ্যাস গড়া সহজ: যাঁদের সকালে সময় বের করা তুলনামূলক সহজ, তাঁদের জন্য এই সময়টি নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলতে দারুণ কার্যকর।

কাজের ব্যস্ততার ঝামেলা নেই: দিনের কাজের বা ব্যস্ততা শুরু হওয়ার আগেই হাঁটা শেষ করে ফেলায় পরবর্তী সময়ে ব্যস্ততার অজুহাতে ব্যায়াম বাদ পড়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়।

খালি পেটে হাঁটলেই কি ওজন দ্রুত কমে?
অনেকেরই ধারণা, সকালে খালি পেটে হাঁটলে বুঝি সবচেয়ে বেশি ওজন কমে। এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি হলো—দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর শরীরে গ্লাইকোজেন ও ইনসুলিনের মাত্রা কিছুটা কম থাকে, ফলে শরীর শক্তির জন্য সঞ্চিত চর্বি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ায়।

তবে মনে রাখবেন, শুধু খালি পেটে সকালবেলা হাঁটলেই ম্যাজিকের মতো ওজন কমে যাবে, এমনটা নয়। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপের পাশাপাশি সুষম খাবার, মোট ক্যালোরি গ্রহণ এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর নজর দেওয়া সবচেয়ে জরুরি। আর সুস্থ ব্যক্তিরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলে হালকা বা মাঝারি গতিতে খালি পেটে হাঁটতেই পারেন, তবে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভূত হলে সঙ্গে সঙ্গে হাঁটা থামিয়ে বিশ্রাম নেওয়া উচিত।

২. ডায়াবেটিস থাকলে কখন হাঁটবেন?
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খাবারের পর হাঁটা বিশেষভাবে উপকারী।

প্রধান খাবারের পর ১০ থেকে ১৫ মিনিট স্বাভাবিক বা আরামদায়ক গতিতে হাঁটলে খাবার-পরবর্তী রক্তের শর্করার মাত্রা হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়া অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

তবে যাঁদের ইনসুলিন বা রক্তে শর্করা কমানোর জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ খেতে হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যায়ামের সময় ও খাবারের সময়ের ব্যবধান নিয়ে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা উচিত।

৩. বিকেল বা সন্ধ্যার হাঁটা কাদের জন্য ভালো?
যাঁদের সকালের সময়টা ব্যস্ততায় কাটে, তাঁদের জন্য বিকেল বা সন্ধ্যার হাঁটা হতে পারে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও চমৎকার বিকল্প।

সতেজ মন: সারাদিনের কাজের ক্লান্তি শেষে বিকেলে বা সন্ধ্যায় কিছুক্ষণ হাঁটলে শরীর সক্রিয় থাকে এবং মনও যথেষ্ট সতেজ হয়।

নিষ্ক্রিয়তা দূর: যাঁদের অফিসে বা ডেস্কে বসে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়, তাঁদের জন্য সন্ধ্যার হাঁটা একটানা বসে থাকার অভ্যাস ভাঙার একটা দারুণ উপায়।

সতর্কতা: তবে রাতের ঘুমের ঠিক আগে খুব দ্রুতগতিতে বা অনেক দীর্ঘ সময় ধরে ব্যায়াম না করাই ভালো, বিশেষ করে এতে যদি আপনার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে। এছাড়া রাতের খাবারের পর ১০ থেকে ১৫ মিনিট হালকা গতিতে হাঁটলে খাবার হজম ভালো হয় এবং শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে।

হৃদস্বাস্থ্যের জন্য কোনটা সেরা?
হৃদ্‌যন্ত্র সুস্থ রাখতে নির্দিষ্ট কোনো সময়ের চেয়ে নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুতগতিতে হাঁটা যদি আপনার নিয়মিত রুটিনের অংশ হয়, তবে তা কার্ডিওভাসকুলার ফিটনেস উন্নত করতে, রক্তচাপ ও ওজন নিয়ন্ত্রণে ম্যাজিকের মতো কাজ করে।

সপ্তাহে ঠিক কতক্ষণ হাঁটা উচিত?
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের (AHA) পরামর্শ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য—

সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যকলাপ প্রয়োজন।

অর্থাৎ, সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন প্রায় ৩০ মিনিট করে দ্রুত হাঁটার লক্ষ্যমাত্রা রাখতে পারেন।

শেষ কথা: একদমই না হাঁটার চেয়ে দিনের যেকোনো সময় একটুখানি হাঁটা অনেক বেশি ভালো। সকাল হোক, বিকেল হোক কিংবা খাওয়ার পর—যে সময়টি আপনার জীবনযাত্রার সঙ্গে মানানসই এবং আপনি নিয়মিত চালিয়ে যেতে পারবেন, আজই সেই সময়টি বেছে নিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *