তিনগুণ লাভ তবুও হুড়মুড়িয়ে পতন শেয়ার বাজারে! কিউপিডের এমন অদ্ভুত আচরণ দেখে মাথায় হাত বিনিয়োগকারীদের

শেয়ার বাজারে প্রায়শই এমন কিছু অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে কোনো কোম্পানি দারুণ ফলাফল বা বিশাল প্রফিট দেওয়ার পরেও তার শেয়ারের দাম উল্টো পতনের মুখে পড়ে। কনডম ও স্বাস্থ্যপণ্য প্রস্তুতকারক শীর্ষস্থানীয় সংস্থা কিউপিড লিমিটেড (Cupid Limited)-এর ক্ষেত্রে সম্প্রতি ঠিক এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে। চলতি অর্থবছর ২০২৬-২৭-এর প্রথম ত্রৈমাসিকে (এপ্রিল-জুন) সংস্থাটির নীট মুনাফা এক লাফে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তা সত্ত্বেও সোমবার ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে (এনএসই) এই কোম্পানির শেয়ারের দাম ২ শতাংশেরও বেশি কমে ২৫৬.৮০ টাকায় নেমে এসেছে।
ত্রৈমাসিক ফলাফলে দুর্দান্ত উল্লম্ফন
গত শনিবার কিউপিড তাদের প্রথম ত্রৈমাসিকের (Q1) চোখ ধাঁধানো আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের একই ত্রৈমাসিকে কোম্পানিটির সমন্বিত নীট মুনাফা ছিল ১৫ কোটি টাকা, যা থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে সোজা ৪৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। শুধু তাই নয়, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কোম্পানির পরিচালন আয়ও (Operational Revenue) ১৫৯ শতাংশ বেড়ে ১.৫৫ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে।
পাশাপাশি, সংস্থার ইবিআইটিডিএ (EBITDA) ২৬৫ শতাংশ লাফিয়ে ৬০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে এবং ইবিআইটিডিএ মার্জিন ১,১২৭ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে এক ধাক্কায় ৩৯ শতাংশে এসে ঠেকেছে। এই শক্তিশালী পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে কোম্পানির মূল ব্যবসা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভ করছে।
দারুণ স্টক ট্র্যাক রেকর্ড ও মাল্টিব্যাগার রিটার্ন
সাম্প্রতিক এই সামান্য পতন সত্ত্বেও কিউপিডের শেয়ার দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের রীতিমতো ধনী করে তুলেছে। গত সপ্তাহে এই স্টকটি ১৪% এবং গত এক মাসে ২৪% বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি ২০২৬ সালে এখনও পর্যন্ত এটি বিনিয়োগকারীদের প্রায় ১৫০% অবিশ্বাস্য রিটার্ন উপহার দিয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী পারফরম্যান্সের কথা বলতে গেলে, এই স্টকটি প্রকৃত অর্থেই একটি মাল্টিব্যাগার হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এটি এক বছরে ৬৮৩%, তিন বছরে ৮,৯২৩% এবং গত পাঁচ বছরে ১০,৯৭৯% পর্যন্ত দুর্দান্ত রিটার্ন দিয়েছে। বর্তমানে এই কোম্পানিটির মোট বাজার মূলধন (Market Cap) ৩৫,১৯১ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
রপ্তানি বৃদ্ধি ও নতুন ব্যবসার সুযোগ
কিউপিড তাদের আন্তর্জাতিক বি২বি স্বাস্থ্যসেবা এবং দেশীয় এফএমসিজি (FMCG) ব্যবসায় দুর্দান্ত গতি বজায় রেখেছে। রপ্তানি পোর্টফোলিও জুড়ে অন্তত ১০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর করার ফলে মার্জিন এবং সামগ্রিক আয় দুটোই বেড়েছে। এছাড়া, ডলারের বিপরীতে টাকার মজবুত অবস্থাও রপ্তানি রাজস্ব বাড়াতে সাহায্য করেছে।
কোম্পানিটি তাদের আইভিডি (IVD) কিট পোর্টফোলিওর জন্য ভারতের বিভিন্ন রাজ্য সরকারের কাছ থেকে বড় ধরনের অর্ডার পাওয়ার জোরালো আশা করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সিই (CE) সার্টিফিকেশন পাওয়ার ফলে ব্যবসার নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি মেগা চুক্তি বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যা ভবিষ্যতে কোম্পানির প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
এত ভালো ফলাফলের পরেও কেন কমল শেয়ারের দাম?
চমকপ্রদ ত্রৈমাসিক ফলাফল সত্ত্বেও স্টক পতনের নেপথ্যে মূলত কাজ করেছে ‘প্রফিট বুকিং’ (Profit Booking) বা মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা। কিউপিডের স্টকটি বিগত এক বছরে ৬৫০%-এরও বেশি চোখ ধাঁধানো রিটার্ন দিয়ে ইতিমধ্যেই বিনিয়োগকারীদের ভালোমতো লাভ পাইয়ে দিয়েছিল। শেয়ার বাজারের চিরন্তন নিয়ম অনুযায়ী, বড় বিনিয়োগকারীরা প্রায়শই “গুজবে কিনে খবরে বেচার” কৌশল নিয়ে চলেন।
বাজার আগে থেকেই এই দুর্দান্ত ফলাফলের আশা করে বসেছিল, ফলে যখনই বিশাল মুনাফার খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে এল, বড় বিনিয়োগকারীরা নিজেদের লাভ পকেটে পুরতে শেয়ার বিক্রি করা শুরু করলেন। দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বমুখী থাকা কোনো স্টকের ক্ষেত্রে এই ধরনের সাময়িক দরপতনকে শেয়ার বাজারের পরিভাষায় একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর সংশোধন (Healthy Correction) হিসেবেই দেখা হয়। কোম্পানির মৌলিক বা ফান্ডামেন্টাল কার্যক্রমে কোনো রকম ঘাটতি বা সমস্যা নেই।