হাসপাতালের বিল নিয়ে আর চিন্তা নেই! পঞ্জাবের মেগা স্বাস্থ্য প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার ক্যাশলেস চিকিৎসায় উপকৃত লাখ লাখ মানুষ

টাকার অভাবে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা যাতে থেমে না যায়, সেই লক্ষ্যেই পঞ্জাব সরকারের ‘মুখ্যমন্ত্রী সেহত যোজনা’ (Chief Minister’s Health Scheme) সাধারণ মানুষের জীবনে আশার আলো হয়ে উঠেছে। এই প্রকল্পের অধীনে এখনও পর্যন্ত রাজ্যের সর্বাধিক ব্যবহৃত ১০টি চিকিৎসা পদ্ধতির জন্য মোট ২,৪৪,৪৬৮টি ক্যাশলেস চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান করা হয়েছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ৩১৬.৫০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

সপ্তাহে একাধিকবার ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন এমন রোগী থেকে শুরু করে জটিল হার্ট সার্জারি, হাঁটু প্রতিস্থাপন কিংবা জরুরি সিজারিয়ান ডেলিভারির মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা— এই প্রকল্পের দৌলতে উপকৃত হয়েছেন সাধারণ মানুষ, যা অন্যথায় বহু পরিবারের পক্ষেই বহন করা অসম্ভব ছিল।

দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল রোগের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাগুলিতে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং কিডনি রোগের মতো দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। পঞ্জাবও এর বাইরে নয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ডায়ালাইসিস, কার্ডিয়াক কেয়ার এবং জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্টের ক্রমবর্ধমান চাহিদা স্পষ্ট করে দেয় যে, আধুনিক সমাজের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখন এমন সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যেগুলির জন্য সাধারণ হাসপাতালের সাধারণ চিকিৎসার চেয়েও চলমান, বিশেষায়িত এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

কোন চিকিৎসায় কত সেবা মিলল?
পঞ্জাব রাজ্য স্বাস্থ্য সংস্থা (SHA)-র দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই প্রকল্পের আওতায় সবথেকে বেশি যে পরিষেবাগুলি দেওয়া হয়েছে, তার একটি বিস্তৃত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

ক্রনিক হিমোডায়ালাইসিস: এই প্রকল্পের অধীনে সর্বাধিক সম্পাদিত পদ্ধতি হলো ডায়ালাইসিস। ৩০.৬৫ কোটি টাকারও বেশি খরচে মোট ১,৮৭,৬৫৬টি ডায়ালাইসিস সেশন প্রদান করা হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত রোগীরা প্রতিবার হাসপাতালে যাওয়ার আর্থিক দুশ্চিন্তা ছাড়াই নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারছেন।

ল্যাপারোস্কোপিক গলব্লাডার সার্জারি: দ্বিতীয় সর্বাধিক সম্পাদিত এই পদ্ধতির মাধ্যমে ১৭,৬৯৮টি পিত্তথলির অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

টোটাল নি রিপ্লেসমেন্ট (হাঁটু প্রতিস্থাপন): বয়সজনিত কারণে হাঁটুতে ব্যথায় ভোগা হাজার হাজার বয়স্ক রোগীকে স্বাভাবিক চলাফেরার ক্ষমতা ও স্বনির্ভরতা ফিরিয়ে দিতে মোট ১০,৭৫১টি হাঁটু প্রতিস্থাপন সার্জারি করা হয়েছে।

মাতৃস্বাস্থ্য ও সিজারিয়ান ডেলিভারি: সংকটময় মুহূর্তে পরিবারের আর্থিক বোঝা কমাতে মোট ৯,৩১৭ জন নারীকে সম্পূর্ণ ক্যাশলেস সিজারিয়ান ডেলিভারি পরিষেবা দেওয়া হয়েছে।

হৃদরোগের চিকিৎসা: কার্ডিয়াক কেয়ারের ক্ষেত্রে মোট ৮,৭৩৪ জন রোগীর পারকিউটেনিয়াস ট্রান্সলুমিনাল করোনারি অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি (PTCA) সহ ডায়াগনস্টিক অ্যাঞ্জিওগ্রাফি এবং ৫৫৪ জন রোগীর করোনারি আর্টারি বাইপাস গ্রাফটিং (CABG) সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। এর ফলে অর্থের অভাবে কোনো রোগীর জীবন রক্ষাকারী হৃদরোগের চিকিৎসা থমকে থাকেনি।

এছাড়াও এই প্রকল্পের আওতায় কিডনিতে পাথরের চিকিৎসার জন্য ৫,৭৭০টি পারকিউটেনিয়াস নেফ্রোলিথোটমি (PCNL), ২,propertyPath (নিম্ন মূত্রনালীর অস্ত্রোপচার) ২,২৪৭টি, ৯১১টি সিমেন্টবিহীন টোটাল হিপ রিপ্লেসমেন্ট এবং ৮৩০টি র‍্যাডিক্যাল সার্জিক্যাল পদ্ধতি সফলভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
এই বিশাল সাফল্যের বিষয়ে পঞ্জাবের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী ড. বলবীর সিং বলেন, “যেকোনো স্বাস্থ্য কর্মসূচির সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি কাগজে-কলমে থাকা সুবিধাভোগীর সংখ্যা নয়, বরং বড় আর্থিক সংকটের মুখে না পড়েও সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পাওয়ার পরিবারগুলির স্বস্তি। এই পরিসংখ্যানটি এমন হাজার হাজার পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করে, যারা হাসপাতালের বিলের দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে নয়, বরং সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।”

তিনি আরও জানান, আজীবন ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হওয়া রোগী, হাঁটু প্রতিস্থাপন করাতে আসা কোনো বয়স্ক ব্যক্তি, নিরাপদ সিজারিয়ান ডেলিভারির মুখ দেখা মা কিংবা জরুরি হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে— এই প্রকল্প নিশ্চিত করেছে যে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে যেন আর্থিক অনটন বা সীমাবদ্ধতা কোনোভাবেই বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

পঞ্জাবের অন্যতম শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা কবচ
এই প্রকল্পের লাগাতার সম্প্রসারণ পঞ্জাবের সামাজিক পরিকাঠামোয় এক সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনছে। স্বাস্থ্য পরিষেবা সহজলভ্য হওয়ায় আরও বেশি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী রোগকে জয় করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন। বয়স্ক মানুষেরা তাদের চলাচলের শক্তি ফিরে পাচ্ছেন, মায়েদের নিরাপদ প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব নিশ্চিত হচ্ছে এবং সবচেয়ে বড় কথা, সাধারণ পরিবারগুলি হাসপাতালের বিল মেটানোর দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেয়ে রোগীর সুস্থতার দিকে মন দিতে পারছে। সব মিলিয়ে, এই স্বাস্থ্য প্রকল্প বর্তমানে পঞ্জাবের অন্যতম শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষকে বড় ধরনের আর্থিক ধাক্কা থেকে রক্ষা করছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *