আদানির ১২ লক্ষ কোটির মেগা মাস্টারপ্ল্যান! কোন স্টকগুলিতে টাকা ঢাললে রাতারাতি কোটিপতি হতে পারেন?

বন্দর থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ— পরিকাঠামো খাতের পরিধি বিস্তারে সর্বদাই আগ্রাসী নীতি নিয়ে চলেছে আদানি গ্রুপ (Adani Group)। আর এই বিপুল পরিকাঠামো ব্যয় বা ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার (CapEx) এখন সরাসরি প্রভাব ফেলছে দেশের শেয়ার বাজার তথা দালাল স্ট্রিটে। আদানিদের এই বিশাল সম্প্রসারণের ফলে বন্দর, বিদ্যুৎ প্রযুক্তি এবং নির্মাণ খাতের বিভিন্ন উৎপাদক ও ঠিকাদার সংস্থার অর্ডার বুক রাতারাতি ফুলেফেঁপে উঠেছে। আর তার হাত ধরেই হু হু করে বাড়ছে ওই সমস্ত সংস্থার শেয়ারের দাম।

শেয়ার বাজারের তথ্য বলছে, গত দুই বছরে হিটাচি এনার্জি ইন্ডিয়ার শেয়ার লাফিয়ে বেড়েছে ১৯৭%। পাশাপাশি, সেমইন্ডিয়া প্রজেক্টস এবং জিই ভার্নোভা টিঅ্যান্ডডি ইন্ডিয়ার শেয়ার যথাক্রমে ১৫২% ও ১৪৭% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়াও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিএইচইএল (BHEL)-এর শেয়ার এক বছরে ৭৯% এবং পিএসপি প্রজেক্টস-এর শেয়ার ৩৯% পর্যন্ত ওপরে উঠেছে। স্পষ্টতই, বিনিয়োগকারীরা এখন সেই সমস্ত সংস্থায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করছেন, যেগুলি আদানি গ্রুপের এই বিশাল মূলধনী ব্যয় থেকে সরাসরি বড় অর্ডার পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছে।

বিশাল অঙ্কের মূলধনী ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা
আদানি গ্রুপ বিগত মার্চ মাসে সমাপ্ত অর্থবছরে মূলধনী ব্যয়ে রেকর্ড ১.৫৩ লক্ষ কোটি টাকা খরচ করেছে, যা যে কোনো ভারতীয় কর্পোরেটের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বার্ষিক ব্যয়। এর প্রায় ৮০ শতাংশই বিভিন্ন ভেন্ডর বা সহযোগী অংশীদারদের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়েছে।

চলতি অর্থবছরে আদানি গ্রুপ প্রায় ২.১ লক্ষ কোটি টাকার মূলধনী ব্যয়ের নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। শুধু তাই নয়, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তাদের বিভিন্ন ব্যবসায় প্রায় ১২৫ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১২ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করার বিশাল পরিকল্পনা রয়েছে।

আদানির নতুন কৌশল: বিক্রেতা নয়, এবার ‘কৌশলগত অংশীদার’
আদানি গ্রুপের এই বিশাল কৌশল কেবল পরিকাঠামো তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি প্রকল্প মালিক এবং সরবরাহকারীদের মধ্যকার প্রথাগত সম্পর্ককেও সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছে। আদানি গ্রুপের সিএফও যুগশিন্দর ‘রবি’ সিং সম্প্রতি বিনিয়োগকারী ও বিশ্লেষকদের জানিয়েছেন যে, ক্রমবর্ধমান এই মূলধনী ব্যয়ের জেরে বড় আকারের প্রকল্পগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে বহিরাগত বিশেষজ্ঞ সংস্থাগুলোর ওপর তাদের নির্ভরতা বাড়াতে হবে।

আদানি এখন আর এই সংস্থাগুলোকে কেবল সাধারণ বিক্রেতা বা ভেন্ডর হিসেবে দেখে না, বরং তাদের “কৌশলগত অংশীদার” (Strategic Partner) হিসেবে বিবেচনা করছে। আদানির মূল লক্ষ্য হলো এই অংশীদারদের “বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান” হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করা, যাতে আগামী কয়েক বছরে এমন শত শত ভেন্ডর বড় ব্যবসায়িক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। আদানিদের এই বিজনেস মডেলটি অ্যাপলের বিখ্যাত ‘এক্সটেন্ডেড এন্টারপ্রাইজ মডেল’-এর সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।

কোন কোন কোম্পানির ভাগ্য ঘুরছে এই মেগা প্রকল্পে?
পিএসপি প্রজেক্টস (PSP Projects): আদানি তাদের বৃহৎ নির্মাণ পরিকল্পনাগুলোকে গতি দিতে এই নির্মাণ সংস্থাটির ৩৪.৪১% অংশীদারিত্ব অধিগ্রহণ করেছে। এর ফলে পিএসপি-র অর্ডার বুক ৮৫% বৃদ্ধি পেয়ে ১৩,৪৪৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। যদিও অর্ডার বাড়লেও এর ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল চক্র ও রিটার্ন (ROCE) কিছুটা প্রভাবিত হয়েছে, তবুও ধারাভি পুনর্গঠন বা মতিলাল নগরের মতো বড় রিয়েল এস্টেট প্রোজেক্টের সুবাদে এই সংস্থার সামনে বিশাল সুযোগ রয়েছে।

সেমইন্ডিয়া প্রজেক্টস (Semindia Projects): আদানির প্রোমোটার কোম্পানি প্রাক্তন আইটিডি সিমেন্টেশনের ৬৭.৪৬ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী অংশীদারিত্ব অধিগ্রহণ করায় এই সংস্থার পোর্টফোলিওতে বন্দর, টানেল ও মেট্রো প্রকল্পের কাজ হু হু করে বাড়ছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দিনে সেমইন্ডিয়ার পোর্টফোলিওতে আদানি গ্রুপের প্রকল্পের অংশ ১৪% থেকে বেড়ে প্রায় ৫০% এ পৌঁছাবে।

হিটাচি এনার্জি ও জিই ভার্নোভা: আদানি এনার্জি সলিউশনস-এর গ্রিড প্রযুক্তি এবং হাই ভোল্টেজ করিডোর নির্মাণের সুবাদে হিটাচি এনার্জি ইন্ডিয়া এবং জিই ভার্নোভা টিঅ্যান্ডডি ইন্ডিয়া হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা অর্ডার পকেটে পুরেছে।

বিএইচইএল (BHEL): আদানি গ্রুপ থেকে বিএইচইএল প্রায় ৬,৬৭৩ কোটি টাকার রাজস্ব পেয়েছে, যা তাদের মোট বিক্রয়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। আগামী দিনে আদানি পাওয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৪৫ গিগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়ায় বিএইচইএল-এর মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কাজের পরিধি আরও বহুগুণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সাফল্যের পাশাপাশি রয়েছে ঝুঁকির কথাও
স্বাভাবিকভাবেই এত বড় অঙ্কের বিনিয়োগ এবং একটিমাত্র প্রধান গ্রাহকের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীলতা কিছু না কিছু ঝুঁকিও তৈরি করে। দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে কার্যকরী মূলধন চক্র দীর্ঘ হওয়া কিংবা কাঙ্ক্ষিত নগদ প্রবাহ বা রিটার্ন না পাওয়ার ঝুঁকিও থেকে যায়। তা সত্ত্বেও, আদানি গ্রুপের এই ১২ লক্ষ কোটি টাকার মেগা ব্যয় পরিকল্পনা নির্মাণ, ভারী প্রকৌশল এবং বিদ্যুৎ প্রযুক্তির পুরো ইকোসিস্টেমকে বদলে দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এই সমস্ত সহযোগী সংস্থাগুলি যদি অর্ডারের পাহাড়কে নগদ অর্থে রূপান্তরিত করতে সফল হয়, তবে তা আদানি সাম্রাজ্যের পাশাপাশি ভারতীয় কর্পোরেট জগতেও এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *