বর্ষার দিনে কি বাড়ে মাইগ্রেনের কষ্ট? বৃষ্টির সঙ্গে এই যন্ত্রণার আসল যোগসূত্র কী? জেনে নিন

অনেকের কাছেই বর্ষার প্রথম বার্তা হলো ভেজা মাটির গন্ধ, ঠাণ্ডা হাওয়া আর মাথার ওপর জমে থাকা কালো মেঘ। তবে মাইগ্রেনে আক্রান্তদের জন্য এই আবহাওয়া বয়ে আনতে পারে সম্পূর্ণ অন্য এক অভিজ্ঞতা— দপদপে মাথাব্যথা, বমি ভাব, আলো বা শব্দের প্রতি তীব্র সংবেদনশীলতা, যা কখনও কখনও বৃষ্টি নামার আগেই শুরু হয়ে যায়।

তাহলে প্রশ্ন হলো, বর্ষা কি আদতে মাইগ্রেনের সূত্রপাত ঘটাতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সত্যি হলেও, বৃষ্টি সরাসরি বা সকলের ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের একমাত্র কারণ নয়। আবহাওয়া সংবেদনশীলতা ব্যক্তিবিশেষে আলাদা হতে পারে। দিল্লির পিএসআরআই হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট নিউরোলজিস্ট ডাঃ ভাস্কর শুক্ল-এর মতে, বৃষ্টির মরসুমে পরিবেশ ও জীবনযাত্রার বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটে, যা মাইগ্রেনে আক্রান্ত ব্যক্তিদের এই সমস্যার মুখে পড়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

বায়ুমণ্ডলের চাপ কি এর জন্য দায়ী?
আবহাওয়া ও মাইগ্রেনের সংযোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় ব্যারোমেট্রিক বা বায়ুমণ্ডলের চাপ নিয়ে। ডাঃ শুক্লার কথায়, ঝড় বা বৃষ্টির সময় বায়ুমণ্ডলের চাপে তারতম্য ঘটে। মাইগ্রেনে আক্রান্ত কিছু মানুষ এই পরিবর্তনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হন। গবেষণাতেও নিম্নচাপ, আর্দ্রতা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টির সঙ্গে মাথাব্যথার কিছু যোগসূত্র পাওয়া গেছে, তবে এটি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ, বৃষ্টি নিজে থেকে এই রোগ তৈরি করে না, বরং এটি সংবেদনশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ট্রিগার বা অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

আর্দ্রতা এবং ডিহাইড্রেশনের সমস্যা
বর্ষাকালে আর্দ্রতা অনেকটাই বেড়ে যায়। আর্দ্র ও গরম আবহাওয়া বেশি ঘাম ও তরল হ্রাসের কারণ হতে পারে। অথচ মেঘলা বা ঠাণ্ডা আবহাওয়া থাকায় মানুষ অনেক সময় কম জল পান করেন।

ডিহাইড্রেশন বা জলের অভাব মাইগ্রেনের একটি অন্যতম পরিচিত কারণ।

আর্দ্রতা, ঘাম হওয়া এবং কম জল খাওয়ার এই যৌথ সংমিশ্রণই অনেক সময় মাইগ্রেনের আক্রমণ ডেকে আনে।

দৈনন্দিন রুটিনের পরিবর্তন
আবহাওয়া ছাড়াও বর্ষার দিনে মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে বড় পরিবর্তন আসে। যেমন:

দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা বা কম ঘুমানো

শরীরচর্চা কমিয়ে দেওয়া

খাওয়া-দাওয়ায় অনিয়ম বা সকালের খাবার বাদ দেওয়া

চা বা কফির মাত্রাতিরিক্ত সেবন

ট্রাফিক ও যাতায়াতের সমস্যায় মানসিক চাপ বেড়ে যাওয়া

মাইগ্রেন রুটিনের পরিবর্তনের প্রতি খুবই সংবেদনশীল। তাই বৃষ্টির দিনে একটু অনিয়মই ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া ঘরের আর্দ্রতা থেকে ছত্রাক জন্মানো বা কড়া গন্ধও অনেকের ক্ষেত্রে ট্রিগার হিসেবে কাজ করে।

মাইগ্রেন কি শুধু সাধারণ মাথাব্যথা?
মাইগ্রেনের ব্যথা সাধারণ কোনো মাথাব্যথা নয়। এর লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:

মাথার এক বা উভয় পাশে দপদপানি বা স্পন্দিত ব্যথা

বমি ভাব ও বমি হওয়া

আলো বা শব্দের প্রতি চরম সংবেদনশীলতা

চিকিৎসা ছাড়া এই ব্যথা ৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ব্যথার আগে বা সময়ে ঝিলমিল আলো বা অন্ধবিন্দুর মতো ‘অরা’ (Aura) উপসর্গও দেখা দিতে পারে।

বর্ষায় মাইগ্রেন থেকে বাঁচতে কী করবেন?
নিজস্ব প্যাটার্ন বুঝে সেই অনুযায়ী চলা হলো সবচেয়ে ভালো উপায়। মাথাব্যথার একটি ডায়েরি রাখতে পারেন, যেখানে আবহাওয়া, ঘুম, খাবার ও জলের হিসাব লিখে রাখা যায়। বিশেষ কিছু টিপস মেনে চলতে পারেন:

পর্যাপ্ত জল পান করুন, যাতে ডিহাইড্রেশন না হয়।

সকালের খাবার সহ কোনো মিল বাদ দেবেন না।

ঘুমের সময় ঠিক রাখুন। ক্যাফিনের মাত্রায় হঠাৎ পরিবর্তন আনবেন না।

ব্যক্তিগত ট্রিগারগুলি চিহ্নিত করুন।

পেইনকিলার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাবধান!
মাথাব্যথা করলেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘন ঘন পেইনকিলার খাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। এর ফলে ‘মেডিকেশন-ওভারইউজ হেডেক’ (Medication-Overuse Headache) হতে পারে, যা মাথাব্যথাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সপ্তাহে দুবারের বেশি পেইনকিলার খাওয়ার প্রয়োজন পড়লে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি?
বর্ষার সব মাথাব্যথাকেই মাইগ্রেন বা আবহাওয়া সংক্রান্ত ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। যদি হঠাৎ করে মারাত্মক তীব্র মাথাব্যথা হয়, অথবা তার সঙ্গে কথা বলতে সমস্যা, দুর্বলতা, অসাড় ভাব, জ্বর, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া বা বারবার বমি হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের জরুরি সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *