রাজনীতিতে এসে ডিমের ভয়? মহুয়া মৈত্রকে সুপ্রিম কোর্টের তুলোধোনা, মিলল না কোনো আইনি সুরক্ষা!

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট শুক্রবার তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) বিতর্কিত সাংসদ মহুয়া মৈত্রার করা একটি বিশেষ আবেদন কঠোরভাবে খারিজ করে দিয়ে এক নজিরবিহীন ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছে। আদালত শুনানির সময় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত সংসদ সদস্য হয়েও রাজনীতিতে দীর্ঘ পথ চলার পর যদি মনে ডিমের জুজু বা ডিম মারার ভয় কাজ করে, তবে তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়। ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া একটি পুলিশি এফআইআর (FIR) ও তদন্তের মুখোমুখি হওয়া এড়াতে মহুয়া মৈত্রা যে অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষার আর্জি জানিয়েছিলেন, তা সুপ্রিম কোর্ট সম্পূর্ণরূপে নাকচ করে দিয়েছে এবং তাঁকে কোনো প্রকার আইনি স্বস্তি দিতে স্পষ্ট অস্বীকার করেছে।
‘স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বুকে গুলি, আর আপনাদের ডিমের ভয়?’
তৃণমূল সাংসদকে আইনি ধাক্কা দিয়ে শীর্ষ আদালত আরও বলেছে যে, দেশের বীর স্বাধীনতা সংগ্রামীর বুক পেতে হাসিমুখে শত শত গুলি খেয়েছিলেন, দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, আর আজ এমন সাধারণ বিষয়ে সামান্য কারণে সর্বোচ্চ আদালতে ছুটে আসতে হয়! বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি শীল নাগুর সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ মহুয়া মৈত্রার সেই আশঙ্কাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে, যেখানে তিনি দাবি করেছিলেন যে শারীরিকভাবে থানায় হাজিরা দিতে গেলে স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা তাঁর ওপর ডিম বা এই জাতীয় বস্তু ছুঁড়তে পারে।
মামলার নেপথ্য কাহিনী
এই গোটা আইনি লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে জানা যায় যে, গত জুন মাসে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকের দুটি আলাদা ভিডিওতে মহুয়া মৈত্রার বিতর্কিত কিছু মন্তব্যকে হাতিয়ার করে এক বিজেপি নেতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশে এফআইআর দায়ের করা হয়েছিল। কৃষ্ণনগর এলাকার একটি আদালতের বাইরে একদল বিজেপি সমর্থক যখন তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিতে এবং ডিম ও টমেটো নিক্ষেপ করতে জড়ো হয়েছিল, ঠিক তার পরেই এই আইনি জটিলতার সূত্রপাত ঘটেছিল। এর আগে গত মাসে কলকাতা হাইকোর্ট এই এফআইআর খারিজ করার দাবিতে দায়ের হওয়া মামলায় তাঁকে সাময়িক সুরক্ষা দিলেও আগামী ১৪ আগস্ট তদন্তকারী কর্মকর্তার সামনে সশরীরে হাজির হওয়ার কড়া নির্দেশ দিয়েছিল।
আদালতে আইনজীবীর আর্জি ও বেঞ্চের প্রশ্ন
এজলাসে মহুয়া মৈত্রার পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন আবেদন জানান যে, একটি সাধারণ ফেসবুক পোস্টের মতো বিষয় নিয়ে মক্কেলের বিরুদ্ধে এই মামলা রুজু হয়েছে। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে তাঁকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের (VC) মাধ্যমে তদন্তকারী কর্মকর্তার জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক। কিন্তু আদালতের বেঞ্চ এই অনুরোধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিচারপতিরা বিস্ময় প্রকাশ করে জানতে চান যে, সাধারণ নাগরিকদের মতো সশরীরে হাজিরা না দিয়ে শুধুমাত্র ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের সুবিধা কেন চাওয়া হচ্ছে? এর নেপথ্যে কি তবে একজন বর্তমান সংসদ সদস্য হওয়ার বিশেষ প্রভাব বা সুবিধা ভোগ করতে চাওয়া হচ্ছে?
উত্তরে আইনজীবীর যুক্তি ছিল যে, মহুয়ার আশঙ্কা রয়েছে তিনি সশরীরে পুলিশ স্টেশনে গিয়ে হাজিরা দিলে উন্মত্ত রাজনৈতিক জনতা তাঁর ওপর আক্রমণ চালাতে পারে। তিনি দাবি করেন যে, বিগত দিনে যখন তিনি নির্বাচনী এলাকায় গিয়েছিলেন, তখন তাঁকে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে ডিম নিক্ষেপ করার মতো ঘটনা ঘটেছিল। তবে শীর্ষ আদালত এই যুক্তিতে সন্তুষ্ট হয়নি। আদালত জানিয়ে দেয় যে কলকাতা হাইকোর্ট ইতিমধ্যেই তদন্তকারী সংস্থার সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করার নির্দেশ দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত আইনজীবীর পক্ষ থেকেই আবেদন প্রত্যাহার করে নেওয়ার আর্জি জানানো হলে, আদালত সেই পিটিশন খারিজ করে দেয়।