Google Earth-এ AI ছবি তৈরির ফিচার, চালুর একদিনেই বন্ধ, জেনেনিন কেন?

গুগল আর্থ প্ল্যাটফর্মে নতুন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ফিচার চালুর মাত্র একদিনের মাথায় তা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিল গুগল। গত ৩০ জুলাই লঞ্চ হওয়া এই ফিচারের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা গুগল আর্থের স্যাটেলাইট, এরিয়াল ও থ্রিডি ছবির ওপর ভিত্তি করে টেক্সট প্রম্পট দিয়ে নতুন ছবি তৈরি করার সুযোগ পেতেন। ‘ন্যানো বানানা ২’ মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই টুলটি সম্পর্কে গুগলের প্রাথমিক দাবি ছিল, এটি বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ইতিহাস কল্পনা করতে কিংবা রিয়েল এস্টেট প্রকল্প ফুটিয়ে তুলতে দারুণভাবে সাহায্য করবে।
কেন মাত্র একদিনের মাথায় বন্ধ করতে হলো ফিচারটি?
ফিচারটি চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এর ব্যাপক অপব্যবহারের নানা নিদর্শন সামনে আসতে শুরু করে। ওপেন সোর্স গবেষক হেঙ্ক ভ্যান এস পরীক্ষা করে দেখেন যে, মেক্সিকো সীমান্তে শরণার্থী সংকট, ইরানের সংবেদনশীল পারমাণবিক কেন্দ্র, এমনকি গাজায় বোমা হামলার পর বিধ্বস্ত হাসপাতালের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল বিষয়েও এই এআই কোনো ধরনের বাধা বা ফিল্টার ছাড়াই ছবি তৈরি করে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনপিআর (NPR) ও বিবিসির প্রতিবেদনে আইফেল টাওয়ার ধসে পড়ার মতো কাল্পনিক দৃশ্য কিংবা গিজার পিরামিড সিঙ্কহোলে তলিয়ে যাওয়ার মতো বহু বানোয়াট ও বিভ্রান্তিকর ছবি তৈরির চাঞ্চল্যকর তথ্যও প্রকাশ্যে আসে।
পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে দেখে গত ৩১ জুলাই গুগল একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায় যে, কোম্পানির নিজস্ব নীতিমালা লঙ্ঘন করে এ ধরনের স্পর্শকাতর ও বানোয়াট ছবির স্ক্রিনশট সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে দেখে তারা ফিচারটি আপাতত সরিয়ে নিচ্ছে। বর্তমানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সুরক্ষাবলয় আরও শক্তিশালী করার কাজ চলছে। গুগলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই ফিচারের মাধ্যমে তৈরি ছবিগুলি মূল গুগল আর্থে অন্য ব্যবহারকারীদের কাছে উন্মুক্ত করা হয়নি এবং প্রতিটি ছবিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপস্থিতি বোঝাতে একটি এআই-জেনারেটেড ওয়াটারমার্ক যুক্ত ছিল।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল দেশের প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগের। প্রতি বছর বর্ষাকালে দেশের নানা প্রান্ত প্লাবিত হয়, সীমান্ত অঞ্চলে বিভিন্ন সময় উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা ঘটে এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানামুখী চর্চা লেগেই থাকে। এমন পরিস্থিতিতে যদি ‘স্যাটেলাইট ছবি’র নামে কোনো ভুয়ো বা বানোয়াট কনটেন্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা যাচাই করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে—বিশেষ করে যখন সাংবাদিক ও গবেষকরা দীর্ঘকাল ধরে গুগল আর্থের স্যাটেলাইট ছবিকে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন।
সাধারণ মানুষের জন্য সতর্কতা
ফিচারটি আপাতত স্থগিত থাকলেও এই প্রযুক্তি সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়নি এবং ভবিষ্যতে আরও কড়া নিরাপত্তা ও সতর্কতার সঙ্গে একই ধরনের পরিষেবা পুনরায় ফিরে আসার পূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বর্তমান সময়ে ফেসবুকে বা অন্য কোনো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ‘গুগল আর্থের ছবি’ দাবি করে হঠাৎ কোনো চাঞ্চল্যকর ছবি বা পোস্ট শেয়ার হলে, তা অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
গুগলের দাবি অনুযায়ী, তাদের জেনারেটিভ এআই দিয়ে তৈরি প্রতিটি ছবির ভেতরে সিন্থআইডি (SynthID) নামের একটি ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক বা জলছাপ থাকে, যা গুগল লেন্স বা জেমিনি অ্যাপের সাহায্যে যাচাই করা সম্ভব। পাশাপাশি, কোনো অপরিচিত সূত্র থেকে আসা ‘ব্রেকিং’ ছবি বা তথ্য শেয়ার করার আগে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা কিংবা নির্ভরযোগ্য ও মূলধারার সংবাদমাধ্যমে একই খবর প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা মিলিয়ে দেখাটাই এখন সবচেয়ে নিরাপদ অভ্যাস। ২০০৫ সালে চালুর পর থেকে গুগল আর্থ বিশ্ববাসীর কাছে স্যাটেলাইট চিত্র, থ্রিডি ভূখণ্ড ও স্ট্রিট ভিউয়ের একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে পরিচিত। এই পরিস্থিতিতে প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করে সেই বিশ্বাসযোগ্যতা কতটা বজায় রাখা সম্ভব হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।