বিশ্বযুদ্ধে পুড়ে ছাই কোটি কোটি ব্যারেল তেল! সৌদি আরামকোর চাঞ্চল্যকর রিপোর্টে উঠে এল ভয়াবহ তথ্য

বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ এবং সামরিক সংঘাত শুধু সাধারণ মানুষের জীবন ও অবকাঠামোই ধ্বংস করেনি, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি সম্পদকেও মারাত্মকভাবে গ্রাস করেছে। তেল পুনরুদ্ধার করতে এবং বিশ্ববাজারকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এখন বছরের পর বছর সময় লাগবে। বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক সংস্থা সৌদি আরামকো (Saudi Aramco)-র সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বিভিন্ন যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের জেরে বিশ্ব প্রায় ২.৬ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল চিরতরে হারিয়েছে। এই জ্বালানির পরিমাণ এতটাই বিশাল যে, তা দিয়ে ভারতের সমস্ত যানবাহন, ট্রেন, বিমান এবং শিল্পকারখানা প্রায় দেড় বছর ধরে নিরাপদে সচল রাখা সম্ভব ছিল।
সৌদি আরামকোর প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে?
সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকোর প্রধান জানিয়েছেন যে, গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের উত্তেজনার পর থেকে বিশ্ব ২.৬ বিলিয়ন ব্যারেল (বা প্রায় ৩৫৫ মিলিয়ন মেট্রিক টনেরও বেশি) অপরিশোধিত তেল হারিয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, বিকল্প পথে তেল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পদক্ষেপ সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী তেলের মজুত বিপজ্জনকভাবে কমে আসছে।
আরামকোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) আমিন নাসের জানিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ খুলে দেওয়া হলেও নিঃশেষিত হয়ে যাওয়া তেলের মজুত পুনরায় আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে প্রায় ১৮ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এর জন্য প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২১ লক্ষ ব্যারেল অতিরিক্ত তেল প্রয়োজন হবে।
এদিকে, তেল উত্তোলনের চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যেও আরামকো গত ৩০ জুন সমাপ্ত ত্রৈমাসিকে তাদের নিট মুনাফা ৪৪% বৃদ্ধি পেয়ে ৩২.৬৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় চালানের পথ বদলাতে বাধ্য হলেও, কোম্পানিটি অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত পণ্য এবং বিভিন্ন রাসায়নিকের চড়া দামের সুফল পেয়েছে।
গাণিতিক হিসাব: ২.৬ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের বিশালতা
ভারতের দৈনিক ব্যবহার: ভারত প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫২ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ব্যবহার করে।
১৫ মাসের জ্বালানি মজুদ: যুদ্ধে নষ্ট হওয়া এই ২.৬ বিলিয়ন ব্যারেল তেল ভারতের ১.৩ বছরের অর্থাৎ প্রায় ১৫ মাসের (প্রায় ৫০০ দিনের) মোট জাতীয় জ্বালানি চাহিদার সমান।
যানবাহনের হিসেব: যদি শুধু যানবাহনের পেট্রোল ও ডিজেলের কথা ধরা হয়, তবে এই অপচয় হওয়া তেল দিয়ে ভারতের ৩০ কোটিরও বেশি গাড়ি দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলতে পারত।
যুদ্ধের আগুনে এত জ্বালানি পুড়ছে কোথায়?
যুদ্ধবিমান ও ট্যাংকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার: একটি আধুনিক যুদ্ধবিমান মাত্র এক ঘণ্টায় হাজার হাজার লিটার জেট ফুয়েল পুড়িয়ে ফেলে। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ভারী সাঁজোয়া যান এবং ট্যাংকের রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল খরচ হয়।
লোহিত সাগর সংকট ও দীর্ঘ রুট: লোহিত সাগরে উত্তেজনার কারণে পণ্যবাহী জাহাজগুলিকে আফ্রিকা মহাদেশ প্রদক্ষিণ করে (কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে) যাতায়াত করতে হচ্ছে। এই দীর্ঘতর সামুদ্রিক পথের কারণে প্রতিটি জাহাজকে অতিরিক্ত লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল পোড়াতে হচ্ছে।
তেল শোধনাগার ও ডিপোতে হামলা: যুদ্ধ চলাকালীন বিভিন্ন তেল কূপ, শোধনাগার এবং মজুত ট্যাংকের ওপর দফায় দফায় হামলার ফলে লক্ষ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হয় পুড়ে ছাই হয়েছে, নয়তো সমুদ্রে ছড়িয়ে নষ্ট হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
বিশ্বের বাজারে যখন ২.৬ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের ঘাটতি তৈরি হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সরবরাহ শৃঙ্খলে বড়সড় ধাক্কা লাগে। এর জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮০-৯০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা ভারতের মতো আমদানি-নির্ভর দেশগুলির আমদানি ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি করে।
অপরিশোধিত তেলের বর্তমান দাম ও আশার আলো
বর্তমানে অবশ্য আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অনেকটাই কমে ৮০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। ইরান-ওমান আলোচনার অগ্রগতি দেখলে মনে হচ্ছে দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে চলা এই সংঘাতের অবসান ঘটতে পারে এবং শীঘ্রই হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক প্রস্তাবিত চুক্তি বাস্তবায়িত হলে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলির ওপর তেহরান নিয়ন্ত্রণের পথ প্রশস্ত হতে পারে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে।