পেট্রোলে ৫০% ইথানল মেশানো হচ্ছে? কেজরিওয়ালের বিস্ফোরক দাবি উড়িয়ে দিলেন অমিত মালব্য

পেট্রোলে ইথানল মিশ্রণ (Ethanol Blending), E20 জ্বালানির গুণমান এবং অ্যাভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল বা ATF-এ ইথানল ব্যবহারের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে কেন্দ্র সরকার ও আম আদমি পার্টির (AAP) মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত চরমে উঠেছে। আম আদমি পার্টির আহ্বায়ক অরবিন্দ কেজরিওয়ালের একাধিক গুরুতর অভিযোগের তীব্র নিন্দা করে বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্য দাবি করেছেন যে, E20-এর বেশি ইথানল মিশ্রণের কোনও সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি এবং বিমান জ্বালানিতে সাধারণ ইথানল মেশানোর প্রশ্নই ওঠে না।
পেট্রোলে ৫০% ইথানল? কী দাবি কেজরিওয়ালের?
সম্প্রতি অরবিন্দ কেজরিওয়াল অভিযোগ করেন যে, দেশে E20 চালুর পর এবার কেন্দ্র সরকার পেট্রোলে ইথানলের পরিমাণ ৫০ শতাংশেরও বেশি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। তাঁর মতে, এই ধরনের নীতি গাড়িগুলির ইঞ্জিনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি সাধারণ মানুষকে আপাতত নতুন পেট্রোল বা ডিজেলচালিত গাড়ি কেনা থেকে বিরত থাকার পরামর্শও দেন তিনি।
‘ভুয়ো খবর’, পাল্টা দাবি অমিত মালব্যর
কেজরিওয়ালের এই সমস্ত দাবিকে সরাসরি “ফেক নিউজ” বা ভুয়ো খবর বলে উড়িয়ে দিয়েছেন অমিত মালব্য। সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল এক্স (X)-এ একাধিক পোস্ট করে তিনি স্পষ্ট জানান যে, E20-এর বাইরে ইথানল মিশ্রণ বাড়ানোর বিষয়ে ভারত সরকার এখনও পর্যন্ত কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
মালব্যর বক্তব্য, ভবিষ্যতে যদি এমন কোনও প্রস্তাব বিবেচনা করাও হয়, তবে তা বাস্তবায়িত করার আগে বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণা, প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং গাড়ি নির্মাতা সংস্থা, তেল বিপণন সংস্থা ও অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে ব্যাপক আলোচনা করা হবে।
E20 জ্বালানি কি সম্পূর্ণ নিরাপদ?
বিতর্কের মাঝেই মালব্য দাবি করেছেন যে, ভারতে বর্তমানে যে ইথানল-মিশ্রিত পেট্রোল বিক্রি হয়, তা ব্যুরো অফ ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস (BIS)-এর নির্ধারিত কঠোর মানদণ্ড মেনেই তৈরি করা হয়। সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগে জ্বালানিটি একাধিক স্তরে মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষাও পেরিয়ে আসে। তাঁর মতে, ভারতের ইথানল ব্লেন্ডিং কর্মসূচি রাতারাতি চালু হয়নি; বরং গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ধাপে ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের পরই E20 দেশজুড়ে বাস্তবায়িত হয়েছে।
ATF-এ ইথানল মেশানোর অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক
অরবিন্দ কেজরিওয়াল আরও এক ধাপ এগিয়ে অভিযোগ করেন যে, সরকার নাকি অ্যাভিয়েশন টারবাইন ফুয়েলে (ATF) ইথানল মেশানোর পরিকল্পনা করছে, যা বিমান চলাচলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তবে এই অভিযোগও সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে দিয়েছেন অমিত মালব্য। তিনি জানান, সরকার সাধারণ ইথানলকে বিমান জ্বালানির সঙ্গে মেশানোর কোনও পরিকল্পনা ঘোষণা করেনি। বরং যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে তা হলো ‘সাসটেইনেবল অ্যাভিয়েশন ফুয়েল’ (SAF), যা সম্পূর্ণ উন্নত প্রযুক্তিতে তৈরি একটি বিশেষ ধরনের পরিবেশবান্ধব বিমান জ্বালানি। মালব্যর মতে, এই SAF আন্তর্জাতিক ASTM মানদণ্ড অনুযায়ী কঠোর পরীক্ষা ও শংসাপত্র প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক অসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (ICAO)-র নির্দেশিকার সঙ্গেও পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
SIAM-এর রিপোর্ট নিয়ে নতুন রাজনৈতিক লড়াই
এই গোটা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ান অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার্স (SIAM)-এর একটি অভ্যন্তরীণ রিপোর্টও। কেজরিওয়ালের দাবি ছিল, ওই নথিতে E20 পেট্রোলে ক্লোরাইড ও আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকার কথা উল্লেখ ছিল, যা যানবাহনের ক্ষতি করতে পারে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন তবে SIAM-কে সেই রিপোর্ট প্রত্যাহার করতে বাধ্য হতে হল?
জবাবে অমিত মালব্য জানান, SIAM ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তাদের অভ্যন্তরীণ রিপোর্টের কিছু অংশ প্রসঙ্গের বাইরে এনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রচার করা হয়েছে। সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী, জ্বালানির গুণমান যাচাই করতে ১৫০টিরও বেশি মানদণ্ডে পরীক্ষা চালানো হয় এবং প্রচারিত তথ্যগুলির সত্যতা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
SIAM কী জানাল?
সংশ্লিষ্ট সংস্থা SIAM-এর তরফে জানানো হয়েছে যে, ক্লোরাইড ও সালফার সংক্রান্ত সতর্কতামূলক নির্দেশিকাগুলি আগে থেকেই কার্যকর রয়েছে। তেল বিপণন সংস্থাগুলি নিয়মিতভাবে গুণমান পরীক্ষা করে থাকে এবং বর্তমান E20 জ্বালানি নিয়ে গাড়ি চালকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার বিন্দুমাত্র কারণ নেই। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে যে তারা সরকারের ইথানল ব্লেন্ডিং কর্মসূচিকে পুরোপুরি সমর্থন করে এবং সেই কারণেই যাতে কোনও বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা তৈরি না হয়, তাই আগের যোগাযোগটি প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের অভিযোগও তুললেন কেজরিওয়াল
অমিত মালব্যর ব্যাখ্যার পরও নিজের অবস্থানে অনড় থেকে কেজরিওয়াল নতুন দাবি করেন যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সমস্ত বৈজ্ঞানিক আপত্তি ও ঝুঁকি উড়িয়ে দিয়ে এই ইথানল নীতি জোরকদমে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে তাঁর বিস্ফোরক দাবি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরোক্ষ চাপেই নাকি আমেরিকা থেকে ইথানল কেনার জন্য ভারতকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। যদিও বিজেপির পক্ষ থেকে এই সমস্ত অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বিতর্ক?
ভারত আগামী কয়েক বছরে দেশের জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যেই ইথানল মিশ্রণ কর্মসূচিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে E20 জ্বালানি, গাড়ির ইঞ্জিনের নিরাপত্তা, বিমান জ্বালানির ভবিষ্যৎ এবং SIAM-এর অবস্থান নিয়ে তৈরি হওয়া এই রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বিতর্ক সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।