‘কোনও ছাত্র আন্দোলন ছিল না’,-ক্ষমতা ছাড়ার দু’বছর পর বিস্ফোরক শেখ হাসিনা

দু’বছর আগে ঠিক আজকের দিনেই গণবিক্ষোভের মুখে পড়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই ঐতিহাসিক ও নাটকীয় ঘটনার দ্বিতীয় বার্ষিকীতে বুধবার দিল্লির ‘ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব’ থেকে একটি ভার্চুয়াল ভাষণে যোগ দেন বাংলাদেশ আওয়ামী লিগের সভানেত্রী। নয়াদিল্লি থেকে সরাসরি এই ভাষণ দিতে গিয়ে আবেগময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ১৯৭৫ সালের কালরাত্রির কথা স্মরণ করতে গিয়ে এবং বিগত দু’বছরের বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

আবেগপ্রবণ সূচনা ও ১৯৭৫-এর স্মৃতি
ভাষণের শুরুতেই অশ্রুসজল হয়ে পড়েন শেখ হাসিনা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, আজ তিনি কেবল একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা এবং একাত্তরের শহিদদের আদর্শের সৈনিক হিসেবে দেশবাসীর সঙ্গে কথা বলছেন। তিনি বলেন, “আমি এমন একজন হিসেবে কথা বলছি যে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে জীবন কাটিয়েছে, যে নিজের দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল, কিন্তু আমি আমার মানুষের থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হইনি।”

‘এটি কোনও শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না’
২০২৪ সালের জুলাই ও অগাস্টের সেই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের স্মৃতিচারণা করে হাসিনা দাবি করেন, সেই গণবিক্ষোভ আদতে কোনও সাধারণ বা শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না। তাঁর কথায়:

শুরু থেকেই তাঁর সরকার আলোচনা, আইনি পথ ও ধৈর্যের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করেছিল।

কিন্তু সংস্কারের আড়ালে একটি সংঘটিত ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সাধারণ ছাত্রদের দাবিকে একটি হিংসাত্মক রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেছিল।

১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগে গড়া স্বাধীন বাংলাদেশকে আজ এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার আক্রমণ
বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনকে কাঠগড়ায় তুলে হাসিনা বলেন, ক্ষমতা দখলের পর থেকেই বর্তমান অবৈধ সরকার জুলাইয়ের ঘটনার প্রকৃত সত্য লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে। তাঁর জমানায় শুরু হওয়া বিভিন্ন ঘটনার তদন্ত বর্তমান প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। হাসক্ষার প্রশ্ন তোলেন, “যদি তাদের মনে ভয় না-ই থাকত, তবে তারা সত্যকে সামনে আসতে দিল না কেন?”

অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও বিএনপি প্রসঙ্গ
দেশীয় অর্থনীতির বেহাল দশা নিয়ে সরব হয়ে হাসিনা দাবি করেন, তাঁর সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতি নিম্নমুখী হয়েছে। তাঁর অভিযোগ:

জিডিপির প্রবৃদ্ধি তলানিতে ঠেকেছে এবং কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবার শিল্প উৎপাদন সংকুচিত হয়েছে।

ব্যাঙ্কগুলিতে ঋণখেলাপির সংখ্যা ও দারিদ্র্যের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বর্তমান প্রশাসন প্রতি মাসে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক থেকে ৭০০-৯০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে দেশ চালাচ্ছে, যার জেরে বহু কারখানা বন্ধ ও ব্যবসায়ীরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

‘আমি আমার জনগণের কাছে ফিরব’
সমস্ত প্রতিকূলতা ও নিজের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সাজানো মামলার কথা মাথায় রেখেও নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ভয় দেখিয়ে তাঁকে তাঁর দেশের মানুষ ও কর্তব্য থেকে দূরে রাখা যাবে না। নিজের প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে তিনি জানান, তাঁর এই ফেরা ক্ষমতার জন্য নয়, বরং দেশের নিরাপত্তা, উন্নয়ন, সুশাসন ও শান্তি পুনরুদ্ধার করে বাংলাদেশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *