‘বাংলাদেশ আজ আরেক পাকিস্তান!’ চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বিস্ফোরক শেখ হাসিনা, দিল্লি থেকে দিলেন হুংকার

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দু’বছর পূর্ণ হওয়ার দিনে ফের একবার চরম আক্রমণাত্মক মেজাজে পাওয়া গেল বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। বুধবার দিল্লির ‘ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব অফ সাউথ এশিয়া’ (FCC)-এর একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে সরাসরি বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। নয়াদিল্লি থেকে ভাষণ শুরু করতেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তিনি এবং কান্নায় তাঁর গলা ধরে আসে। তিনি স্পষ্ট জানান, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবেই আজ তিনি দেশবাসীর সামনে মুখ খুলছেন।
আবেগময় সূচনা ও কান্নায় ভাঙলেন হাসিনা
ভাষণের শুরুতেই নস্টালজিক ও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শেখ হাসিনা। তিনি জানান, দেশ থেকে দূরে থাকলেও তিনি এক মুহূর্তের জন্যও দেশের মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। তাঁর কথায়, “আমি এবং আমার পরিবার বাংলাদেশের জন্য লড়াই করেছি। এটি সেই বাংলাদেশ নয়, যার জন্য ৩০ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছিলেন। আসুন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাগুলি নিয়ে প্রকৃত সত্য সামনে আনি। এটা স্পষ্ট যে, সেগুলি মিথ্যা প্রচারের অংশ ছিল।”
ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে একরাশ ক্ষোভ উগরে দিয়ে হাসিনা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর থেকে দেশজুড়ে ষড়যন্ত্র ও হত্যাকাণ্ড থামেনি। তাঁর দাবি:
গত দু’বছরে অন্তত ১০ হাজার মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন।
প্রায় ১৫ হাজার মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
আওয়ামী লিগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৩ হাজারেরও বেশি মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।
বর্তমান প্রশাসন তদন্ত বন্ধ করে দিয়ে সত্য ও ন্যায়বিচার গলা টিপে ধরেছে, তাদের মূল লক্ষ্য কেবল ক্ষমতা দখল।
২০২৪-এর আন্দোলন ছিল সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র
জুলাইয়ের আন্দোলন প্রসঙ্গে চাঞ্চল্যকর দাবি করে হাসিনা বলেন, গোটা বিষয়টি কখনও কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। স্বার্থান্বেষী মহল সাধারণ ও প্রকৃত ছাত্রদের ব্যবহার করে একটি নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের নীলনকশা তৈরি করেছিল। ভুয়ো প্রচার ও সুপরিকল্পিত হিংসার মাধ্যমে সংবিধানের ওপর আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বর্তমান সরকারের জমানায় সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, দারিদ্র্যের হার নাটকীয়ভাবে বেড়েছে এবং ব্যবসায়ীরা চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
‘ক্ষত নিরাময়ের সময় এসেছে’: মহিবুল হাসান চৌধুরী
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বাংলাদেশের প্রাক্তন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সংকটজনক বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, দেশবাসী মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যবৃদ্ধিতে বিপর্যস্ত, সংখ্যালঘুদের জনপরিসর সংকুচিত হচ্ছে। তিনি আন্তর্জাতিক মহল এবং বন্ধুরাষ্ট্রগুলির কাছে আহ্বান জানান যে, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে সংঘাত হিসেবে না দেখে পুরনো ক্ষত সারিয়ে তোলার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।
‘বাংলাদেশ আরেকটি পাকিস্তানে পরিণত হয়েছে’: সজীব ওয়াজেদ জয়
অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনি বলেন, ক্ষমতাচ্যুতির পরও বাংলাদেশে হিংসা থামেনি এবং রাষ্ট্রসংঘের প্রকাশিত মৃত্যুর পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। একটি বিশেষ ‘দায়মুক্তি’ (ইন্ডেমনিটি) ব্যবস্থার আড়ালে অপরাধীদের রক্ষা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। জয় আরও সতর্ক করে বলেন, “বাংলাদেশ আজ আরেকটি পাকিস্তানে পরিণত হয়েছে,” যা প্রতিবেশী ভারতসহ গোটা অঞ্চলের পক্ষেই অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, কিছুদিন আগেই শেখ হাসিনা জানিয়েছেন যে তিনি সসম্মানে বাংলাদেশে ফিরতে চান। অন্যদিকে, এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে। আজকের এই আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাব থেকে দেওয়া ভার্চুয়াল বার্তা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন মোড় আনতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।