ভাতের ওপর এক চামচ ঘি নাকি পাউরুটিতে মাখন? পুষ্টিবিদদের মতে কোনটা খাওয়া বেশি ডেঞ্জারাস?

সকালের চটজলদি নাস্তায় অনেকেই নরম পাউরুটির সঙ্গে গলানো মাখন মেখে খেতে ভালোবাসেন। আবার অন্যদিকে দুপুরে বা রাতের খাবারে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের ওপর এক চামচ খাঁটি ঘি না হলে যেন বাঙালির ঠিক জমে না। তবে সমস্ত স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মনেই ঘুরপাক খাওয়া চিরন্তন একটি প্রশ্ন হলো—মাখন নাকি ঘি, শরীরের জন্য কোনটি আসলে বেশি স্বাস্থ্যকর? যদিও এই দুটি সুস্বাদু উপাদানই মূলত দুধ থেকেই তৈরি হয়, তবুও পুষ্টিগুণ, রান্নার ধরণ এবং আমাদের শরীরের ওপর এর প্রভাবের দিক থেকে এ দুটির মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও লক্ষণীয় পার্থক্য।

প্রখ্যাত পুষ্টিবিদদের মতে, ঘি এবং মাখন—উভয় উপাদানেই ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে ভরপুর মাত্রায় বিদ্যমান। তবে আপনি কোনটা নিয়মিত খাবেন, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনার বর্তমান শারীরিক অবস্থা, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস এবং পরিমিত গ্রহণের পরিমাণের ওপর।

ঘি কেন তুলনামূলক বেশি স্বাস্থ্যকর বলে বিবেচিত হয়?
খাঁটি ঘি প্রস্তুত করার সময় মাখনকে জ্বাল দিয়ে এর ভেতরের সম্পূর্ণ জলীয় অংশ এবং দুধের কঠিন উপাদানগুলো আলাদা করে ছেঁকে ফেলা হয়। এর ফলে ঘিতে ল্যাকটোজ এবং কেসিনের পরিমাণ থাকে অত্যন্ত নগণ্য। এই কারণে যাদের দুগ্ধজাত খাবারে বা ল্যাকটোজে তীব্র সংবেদনশীলতা (Intolerance) রয়েছে, তাদের জন্য মাখনের তুলনায় ঘি অনেক বেশি সহজপাচ্য বা হজমবান্ধব।

এছাড়া ঘিতে রয়েছে ‘বিউটিরেট’ এবং ‘কনজুগেটেড লিনোলিক অ্যাসিড’ (CLA)-এর মতো কিছু অত্যন্ত উপকারী ফ্যাটি অ্যাসিড। আধুনিক গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে যে, বিউটিরেট আমাদের অন্ত্রের (Gut) কোষের সুরক্ষায় এবং সামগ্রিক পরিপাকতন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে জাদুর মতো কাজ করে। পাশাপাশি, সিএলএ শরীরের ক্ষতিকর প্রদাহ কমাতে বেশ সহায়ক হতে পারে।

রান্নার ক্ষেত্রে কোনটি বেছে নেওয়া ভালো?
বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, উচ্চ তাপে বা বেশি আঁচে রান্নার ক্ষেত্রে ঘিয়ের কোনো তুলনাই হয় না। কারণ ঘিয়ের ‘স্মোক পয়েন্ট’ (Smoke Point) মাখনের তুলনায় অনেক বেশি। অর্থাৎ, বেশি আঁচে রান্না করলেও এটি সহজে পুড়ে যায় না বা কোনো ক্ষতিকর টক্সিক যৌগ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। তাই ডিপ ফ্রাইং, ফোড়ন দেওয়া বা যেকোনো হাই-হিট রান্নার জন্য ঘি একটি চমৎকার বিকল্প।

পক্ষান্তরে, মাখনে জলীয় অংশ বা ওয়াটার কন্টেন্ট থাকায় এটি অতিরিক্ত তাপে খুব দ্রুত পুড়ে যেতে পারে। তাই মাখন সাধারণত ব্রেকফাস্টে পাউরুটি সেঁকতে, টোস্টে, স্যান্ডউইচে কিংবা কম তাপমাত্রার বেকিং ও হালকা রান্নায় ব্যবহার করাই শ্রেয়।

মাখনের কিছু সীমাবদ্ধতা
মাখনে অল্প পরিমাণে হলেও ল্যাকটোজ ও কেসিন উপস্থিত থাকে। তাই যাদের দুগ্ধজাত খাবারে অ্যালার্জি বা সেন্সিভিটি আছে, তারা মাখন খেলে পেটে গ্যাস, ফোলাভাব বা মারাত্মক হজমের সমস্যায় পড়তে পারেন। এ ছাড়া এতে পানি বা জলীয় অংশ থাকায় এর সংরক্ষণকাল বা শেলফ লাইফও বেশ কম। তাই মাখন সবসময় ঠান্ডা ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হয়।

সবার জন্য কি ঘি সমানভাবে উপকারী?
ঘি নিঃসন্দেহে তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর, তবুও এর অর্থ এই নয় যে এটি অনিয়ন্ত্রিত বা সীমাহীন পরিমাণে খাওয়া যাবে। মনে রাখবেন, ঘি এবং মাখন দুটিতেই সম্পৃক্ত চর্বি বা স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ বেশ বেশি থাকে। তাই এগুলো অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি তরতরিয়ে বেড়ে যেতে পারে।

যাদের স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টরল, ফ্যাটি লিভার বা কার্ডিয়াক সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ঘি ও মাখন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অত্যন্ত সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। অন্যদিকে, যাদের শারীরিক ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম, অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন বা বিশেষ কোনো স্বাস্থ্যগত কারণে বেশি ক্যালরির দরকার হয়, তারা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে নিয়মিত পরিমিত ঘি খেতেই পারেন।

পরিমিত আহারই সুস্থতার একমাত্র চাবিকাঠি
সহজ কথায় বলতে গেলে, ঘি বা মাখন—কোনোটিকেই এককভাবে কোনো জাদুকরী ‘সুপারফুড’ বলা চলে না। এগুলো একটি সুষম ও ব্যালেন্সড ডায়েটের অংশ হিসেবে পরিমিত পরিমাণে খেলেই তবে আসল উপকারিতা মেলে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে তাজা শাকসবজি, ফলমূল, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম এবং স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের পাশাপাশি অল্প পরিমাণে ঘি বা মাখন রাখলে শরীর চাঙ্গা থাকে।

অর্থাৎ, রান্নার সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে যদি বেছে নিতে হয়, তবে ঘি কিছুটা হলেও এগিয়ে থাকে। তবে দীর্ঘকাল সুস্থ ও রোগমুক্ত থাকার আসল চাবিকাঠি কোনো একটি নির্দিষ্ট খাবারের মধ্যে লুকিয়ে নেই, বরং আপনার সম্পূর্ণ খাদ্যাভ্যাস এবং পরিমিতিবোধ বজায় রাখার ওপরই নির্ভর করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *