স্বাধীনতার ৮০ বছর! ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস একনজরে

আগামী ১৫ অগাস্ট, ২০২৬-এ ভারত তার ৮০তম স্বাধীনতা দিবস (80th Independence Day) উদযাপন করতে চলেছে। আর এই বিশেষ দিনটি ফের একবার স্মরণ করিয়ে দেয় বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে। ভারতের স্বাধীনতার এই পথটি সহজ বা সংক্ষিপ্ত ছিল না; বরং এটি ছিল প্রায় দু’শো বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে কোটি কোটি বিপ্লবী, সংস্কারক, রাজনৈতিক নেতা এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘ কয়েক দশকের এক অদম্য লড়াই।
গণ-আইন অমান্য আন্দোলন, সশস্ত্র বিপ্লবী নেটওয়ার্ক থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক আলোচনা এবং অগণিত মানুষের ব্যক্তিগত আত্মত্যাগ—ভারতের এই স্বাধীনতার লড়াই শুধু একটি দেশকে মুক্তই করেনি, বরং সারা বিশ্বের উপনিবেশ-বিরোধী আন্দোলনগুলিকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। তবে এই স্বাধীনতার সার্থকতার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ও মর্মান্তিক দেশভাগের বেদনাও, যা ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্টকে একই সঙ্গে আনন্দ এবং গভীর ট্র্যাজেডির দিনে পরিণত করেছিল।
যেভাবে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিস্তার ঘটেছিল
ভারতের ব্রিটিশ প্রভাব শুরু হয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে, যা ১৭ শতকের শুরুতে মূলত একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এদেশে প্রবেশ করেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক জোট, সামরিক জয় এবং আঞ্চলিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই কোম্পানি গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ বা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের পর ব্রিটিশ ক্রাউন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন বাতিল করে এবং ১৮৫৮ সালের ভারত সরকার আইনের মাধ্যমে সরাসরি ক্ষমতা নিজেদের হাতে তুলে নেয়, যার সূচনা ঘটেছিল ‘ব্রিটিশ রাজ’ নামে। একদিকে ব্রিটিশরা দেশে রেলপথ, টেলিগ্রাফ এবং প্রশাসনিক সংস্কার আনলেও, তাদের অর্থনৈতিক শোষণ, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক দমনপীড়ন এবং অবদমনের নীতিই ভারতীয়দের মনে স্বরাজ ও স্বাধীনতার দাবিকে আরও তীব্র করে তোলে।
সুসংগঠিত স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা
১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (INC)-এর প্রতিষ্ঠা ভারতের রাজনৈতিক জাগরণে এক টার্নিং পয়েন্ট হয়ে ওঠে। শুরুতে সংবিধামুলক সংস্কারের মাধ্যমে প্রশাসনে ভারতীয়দের অংশগ্রহণ বাড়ানোর দাবি উঠলেও, সময়ের সঙ্গে তা সম্পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে রূপ নেয়।
বিশ শতকের গোড়ার দিকে জাতীয়তাবাদী চেতনা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বাল গঙ্গাধর তিলক, লালা লাজপত রাই, বিপিন চন্দ্র পাল, গোপাল কৃষ্ণ গোখলে, অ্যানি বেসান্ত এবং পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, সুভাষচন্দ্র বসু, ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ, সরোজিনী নাইডু, মৌলানা আবুল কালাম আজাদের মতো দূরদর্শীরা ভিন্ন মতাদর্শের হলেও স্বাধীনতার অভিন্ন লক্ষ্যে দেশকে নেতৃত্ব দেন।
ভারতের ভাগ্য পরিবর্তনকারী ঐতিহাসিক মাইলফলকগুলি
বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫): ব্রিটিশদের বাংলা বিভাজনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলনের জন্ম হয় এবং ‘স্বদেশী আন্দোলন’ গতি পায়, যা ভারতীয়দের দেশীয় পণ্য ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করে।
জলিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড (১৯১৯): ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অমৃতসরের জলিয়ানওয়ালাবাগে সমবেত হওয়া হাজার হাজার নিরস্ত্র মানুষের ওপর জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে নির্বিচারে গুলি চালায় ব্রিটিশ সেনা। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড গোটা দেশকে স্তব্ধ করে দেয় এবং ব্রিটিশ শাসনের প্রতি জনমত চিরতরে বদলে যায়।
অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০-২২): মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান, স্কুল, আদালত এবং বিদেশি পণ্য বয়কট করে অহিংস আন্দোলনের এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেন।
আইন অমান্য আন্দোলন ও ডান্ডি মার্চ (১৯৩০): গান্ধীর ঐতিহাসিক লবন সত্যাগ্রহ ব্রিটিশদের লবণের একচেটিয়া আধিকারিক অধিকারকে চ্যালেঞ্জ করে এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের আন্তর্জাতিক প্রতীক হয়ে ওঠে।
ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মহাত্মা গান্ধীর ‘ভারত ছাড়ো’ ডাক ব্রিটিশ শাসনের অবিলম্বে অবসান দাবি করে। এর ফলে ব্রিটিশদের ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়।
স্বাধীনতার অন্তিম অধ্যায় ও ‘ট্রাস্ট উইথ ডেস্টিনি’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেনের দুর্বল অর্থনীতি এবং ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপের মুখে ঔপনিবেশিক শাসন টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালের ৩ জুন মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রিটিশ ভারতকে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র—ভারত ও পাকিস্তানে ভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যাক্ট’ বা ভারতীয় স্বাধীনতা আইন পাস হয় এবং ১৪ ও ১৫ অগাস্টের মধ্যবর্তী রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়।
১৫ অগাস্টের ঠিক আগে মধ্যরাতে দিল্লির গণপরিষদে দাঁড়িয়ে জওহরলাল নেহেরু তাঁর অমর ‘Tryst with Destiny’ (ভাগ্যের সঙ্গে অভিসার) ভাষণটি দেন:
“When the world sleeps, India will awake to life and freedom.” নেহেরু দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং স্বাধীন ভারতের সূর্যোদয় ঘটে।
আজকের দিনে স্বাধীনতা উদযাপন
প্রতিবছর দিল্লির লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা দিবসের সূচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর জাতীয় সংগীত, গার্ড অফ অনার এবং দেশের অর্জন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়া হয়। বর্তমানের এই দিনটি আমাদের সংবিধানের মূল ভিত্তি—গণতন্ত্র, ঐক্য, সমতা এবং ন্যায়বিচারের কথা স্মরণ করায়।
স্বাধীনতার ৮০ বছর পর আজ এই দিনটি কেবল জাতীয় উৎসব নয়, বরং পরাধীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করা সেই সমস্ত নাম না জানা বীর শহীদ ও স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানোর দিন, যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা আজ মুক্ত আকাশে নিঃশ্বাস নিচ্ছি।