‘অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, চিরস্থায়ী নয়…’,বঙ্গে এসে বড় বার্তা দিলেন তসলিমা নাসরিন

দীর্ঘ ১৯ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে অবশেষে কলকাতায় ফিরলেন প্রখ্যাত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন। শনিবার কলকাতায় পা রেখে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন, তাঁর এই প্রত্যাবর্তন প্রমাণ করে যে “অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী হতে পারে না।” একইসঙ্গে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন, তাঁর সারাজীবনের লড়াই বরাবরই নারীর অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে থেকেছে, কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়।

শনিবার সন্ধ্যায় রবীন্দ্র সদনে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দেন তসলিমা। অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে আবেগাপ্লুত কন্ঠে তিনি জানান, এই প্রত্যাবর্তন তাঁর দীর্ঘ ব্যক্তিগত নির্বাসনের অবসান ঘটিয়েছে। এই শহরকে তিনি সবসময় নিজের বাড়ি বলেই মনে করেন। বাংলাদেশি লেখিকার কথায়, “কলকাতায় ফিরে এসে মনে হচ্ছে জীবনের এমন একটি অংশে ফিরে এলাম, যা আমি এত বছর আগে এখানে ফেলে গিয়েছিলাম।”

নির্বাসনের স্মৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

অতীতে ১৯৯৪ সালে ধর্ম ও তাঁর লেখালেখি নিয়ে মৌলবাদী গোষ্ঠীর লাগাতার খুনের হুমকির মুখে পড়ে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে ২০০৭ সালেও কলকাতার এক বই বিতর্কের জেরে তসলিমাকে তড়িঘড়ি শহর ছাড়তে হয়েছিল। ২০০৭ সালের সেই যন্ত্রণার কথা স্মরণ করে লেখিকা বলেন, ঠিক কী পরিস্থিতিতে তাঁকে শহর ছাড়তে হয়েছিল, সেই দিনগুলো তিনি আজও ভুলতে পারেননি।

ভবিষ্যতের স্বপ্ন সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি জানান, তিনি এমন একটি দিন দেখতে চান যখন কোনও লেখককে কেবল নিজের মতপ্রকাশের অপরাধে মাতৃভূমি ছাড়তে হবে না। ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে নিজের আপসহীন অবস্থানের কথা স্পষ্ট করে তসলিমা বলেন, “আমি সব ধরনের মৌলবাদের বিরোধী। তবে ইসলামী মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে একটু বেশি মুখ খুলেছি, কারণ ছোটবেলা থেকেই তাদের খুব কাছ থেকে দেখেছি।”

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও নারীর অধিকার

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তসলিমা নাসরিন। তাঁর অভিযোগ, সেখানে ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান বর্তমানে এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে এবং সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমশ সংকুচিত করা হচ্ছে। তবে তমসোময় এই পরিস্থিতির মাঝেও তিনি আশার আলো দেখতে পান। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, আগামীদিনে বাংলাদেশে নারী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করার অধিকার ফিরে পাবেন।

নিজের লেখার অপরাধ ও সমতা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমি শুধু নারী-পুরুষের সমান অধিকার এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবাধিকারের কথা বলেছি। যে কোনও নিয়ম বা মতবাদ যদি মানুষের সমতা ও মানবমর্যাদা কেড়ে নেয়, তবে তা বদলানো উচিত। আমি কেবল এই কথাই বলেছিলাম, অথচ এই সাধারণ কথাগুলোকেই আমার অপরাধ হিসেবে দেখানো হয়েছে।” পাশাপাশি তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে আক্রমণ করেন রক্ষণশীল সমাজকে। তসলিমার মতে, যাঁরা নিজেদের ঘরের মেয়েদের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার বলে মনে করেন, অথচ মুসলিম মেয়েদের ক্ষেত্রে মধ্যযুগীয় বঞ্চনা ও প্রথাকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেন, তাঁরা কখনই মুসলিম সমাজের প্রকৃত বন্ধু হতে পারেন না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *