AI-এর স্বার্থে নোবেলজয়ী প্রযুক্তি বিভাগ ভেঙে দিল গুগল, বড় পদক্ষেপে তোলপাড়!

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রতিযোগিতায় নিজেদের ফ্ল্যাগশিপ মডেল ‘জেমিনাই’ (Gemini)-র উন্নয়নকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে এক ঐতিহাসিক ও বড় সিদ্ধান্ত নিল মার্কিন সার্চ জায়ান্ট গুগল (Google)। বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এবং রসায়নে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত গুগল ডিপমাইন্ডের প্রোটিন গবেষণা প্রকল্প ‘আলফাফোল্ড’ (AlphaFold)-এর মূল দলটি ভেঙে দিয়েছে সংস্থাটি।
প্রযুক্তি বিষয়ক সংবাদমাধ্যম এনগ্যাজেট এবং ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস (FT)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দলটির প্রধান গবেষকদের একটি অংশকে গুগলের অন্দরে নতুন এআই প্রকল্পে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং অনেকেই ইতিমধ্যে কোম্পানি ছেড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থায় পাড়ি জমিয়েছেন।
কী এই আলফাফোল্ড এবং এর ঐতিহাসিক সাফল্য?
এআই-চালিত প্রোগ্রাম ‘আলফাফোল্ড’ প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিড সিকোয়েন্স বা বিন্যাস থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে যেকোনো প্রোটিনের নিখুঁত থ্রিডি (3D) গঠনের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম, যা প্রচলিত পরীক্ষাগার পদ্ধতিতে নির্ধারণ করতে বিজ্ঞানীদের বছরের পর বছর সময় লেগে যেত।
-
প্রোটিন ফোল্ডিং সমস্যার সমাধান: ২০১৮ সালে গুগল ডিপমাইন্ড এই প্রকল্পের কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে ২০২০ সালে আলফাফোল্ড মানবজাতির দীর্ঘ ৫০ বছরের পুরনো জটিল ‘প্রোটিন ফোল্ডিং সমস্যা’র চূড়ান্ত সমাধানকারী হিসেবে বিশ্বজুড়ে ঐতিহাসিক স্বীকৃতি পায়।
-
চিকিৎসা বিজ্ঞান ও নোবেল জয়: বর্তমানে ওষুধ আবিষ্কারের গতি বহুগুণ বাড়াতে, দ্রুত টিকা তৈরিতে এবং অ্যালঝেইমার বা পারকিনসন্সের মতো মারাত্মক নিউরোডিজেনারেটিভ রোগে প্রোটিনের গাঠনিক পরিবর্তন বুঝতে বিশ্বজুড়ে আলফাফোল্ডের জুড়ি মেলা ভার। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্যই ২০২৪ সালে যৌথভাবে রসায়নে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন ডিপমাইন্ডের সিইও ডেমিস হাসাবিস ও গবেষক জন জাম্পার।
কেন ভাঙল আলফাফোল্ড দল?
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুগলের মূল লক্ষ্য এখন তাদের নিজস্ব জেমিনাই এআই মডেলের উন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা। আর সেই লক্ষ্যেই সমস্ত শক্তি ও সম্পদ কেন্দ্রীয়ভাবে এক জায়গায় নিয়ে আসার কৌশল নিয়েছে তারা।
-
গবেষকদের দলবদল: চলতি বছরের জুনেই আলফাফোল্ড দলের অন্যতম মূল কান্ডারি জন জাম্পার গুগল ডিপমাইন্ড ছেড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী এআই কোম্পানি ‘অ্যানথ্রপিক’ (Anthropic)-এ যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন। তাঁর পথ অনুসরণ করে দলের আরও বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ গবেষকও অ্যানথ্রপিকে পাড়ি জমিয়েছেন।
-
গুগলের অন্দরে রদবদল: অন্যদিকে গুগল ডিপমাইন্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তারা এই দলের অনেক সদস্যকেই অভ্যন্তরীণভাবে নিজস্ব জেমিনাই-কেন্দ্রিক প্রকল্পে স্থানান্তরিত করেছে। পাশাপাশি, কিছু সদস্যকে অ্যালফাবেটের নিজস্ব ওষুধ উদ্ভাবনী সহযোগী কোম্পানি ‘আইসোমরফিক ল্যাবস’ (Isomorphic Labs)-এ পাঠানো হয়েছে।
গুগল ডিপমাইন্ডের গবেষণা বিভাগের ভিপি পুশমিত কোহলি এই পরিবর্তনের বিষয়ে জানিয়েছেন, বিগত নয় বছর ধরে তাঁদের প্রধান কৌশল ছিল বড় বড় বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জগুলির মোকাবিলা করা, যেখানে প্রতিটি প্রজেক্ট নির্দিষ্ট স্বতন্ত্র লক্ষ্য নিয়ে কাজ করত। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সেই রণকৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই দুনিয়ার বর্তমান রেষারেষিতে জেমিনাইকে আরও শক্তিশালী ও সর্বগ্রাসী করে তুলতে গুগল তাদের সেরা বৈজ্ঞানিক মেধা ও সম্পদগুলিকে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসার এই বড় বাজিটি ধরেছে। তবে এর ফলে বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট গবেষণা কতটা প্রভাবিত হয়, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে বিশেষজ্ঞদের।