বাবার কোলে বসে ঠোঁটে ঠোঁট রেখে চুমু! ‘আমার মেয়ে না হলে বিয়ে করতাম’— পরিচালকের মন্তব্যে কেঁপে উঠেছিল দেশ!

নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিক। ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্প তখনো রক্ষণশীলতার বেড়াজাল পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। রুপোলি পর্দায় একটি সাধারণ রোম্যান্টিক চুম্বনের দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতেও যখন নির্মাতাদের হাজারবার ভাবতে হতো, ঠিক সেই সময় এক ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ পাতা কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো দেশকে। বাবা ও মেয়ের এক বিতর্কিত ফটোশুট এবং তার জেরে তৈরি হওয়া সামাজিক ঝড় আজও ভারতীয় বিনোদন জগতের অন্যতম অন্ধকার ও আলোচিত অধ্যায় হয়ে রয়েছে। পরিচালক মহেশ ভাট এবং তাঁর বড় মেয়ে পূজা ভাটকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সেই শিউরে ওঠার মতো ইতিহাস আজও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
ম্যাগাজিনের কভারে সেই বিতর্কিত চুম্বন
নব্বইয়ের দশকের একটি জনপ্রিয় ম্যাগাজিনের কভার পেজে প্রকাশিত হয়েছিল পরিচালক মহেশ ভাট এবং তাঁর কন্যা পূজা ভাটের একটি অত্যন্ত আপত্তিকর ও চাঞ্চল্যকর ছবি। যেখানে দেখা গিয়েছিল, বাবার কোলে বসে রয়েছেন অল্পবয়সি পূজা এবং দুজনে একে অপরের ঠোঁটে ঠোঁট রেখে চুমু খাচ্ছেন। তৎকালীন রক্ষণশীল ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় এই ধরনের ছবি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন ও ছিছিক্কার শুরু হয়। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী মহল—সবাই এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানায়।
মহেশ ভাটের সেই বিস্ফোরক মন্তব্য
বিতর্ক এখানেই থামেনি। ছবিটিকে কেন্দ্র করে সমালোচনার ঝড় ওঠার পর একটি সাংবাদিক বৈঠকে মুখ খোলেন খোদ মহেশ ভাট। সেই প্রেস কনফারেন্সে তিনি এমন এক বিতর্কিত মন্তব্য করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও অস্বস্তিকর করে তোলে। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে মহেশ ভাট দাবি করেছিলেন, “পূজা যদি আমার মেয়ে না হতো, তাহলে আমি ওকে বিয়ে করতাম!” পরিচালকের এই বেপরোয়া ও অযাচিত মন্তব্য সেই সময় দেশজুড়ে নৈতিকতার প্রশ্ন তুলেছিল এবং মিডিয়ায় তুমুল হুলস্থুল ফেলে দিয়েছিল।
যদিও পরবর্তীতে এই ঘটনা নিয়ে সাফাই দিয়েছিলেন স্বয়ং পূজা ভাট। তিনি দাবি করেছিলেন, তাঁদের সেই চুম্বনটি মোটেও অন্যরকম কিছু ছিল না, বরং সেটি ছিল অত্যন্ত সরল ও ‘ইনোসেন্ট’ (Innocent)— ঠিক যেমনভাবে একজন বাবা তাঁর সন্তানকে স্নেহের চুম্বন দেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ ও সমালোচকরা কখনই এই যুক্তি সহজে মেনে নিতে পারেননি।
ব্যক্তিগত জীবনের ঝড়ঝাপটা ও সম্পর্কের টানাপোড়েন
বাবার সঙ্গে নাম জড়ানো এই বিতর্কিত অধ্যায় ছাড়াও পূজা ভাটের ব্যক্তিগত জীবন বরাবরই নানা নাটকীয়তা ও ট্র্যাজেডিতে ভরপুর থেকেছে। ২০০০ সালের গোড়ার দিকে অভিনেতা রণবীর শোরের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান পূজা। এমনকি তাঁরা লিভ-ইন সম্পর্কেও ছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্পর্কে মারাত্মক তিক্ততা চলে আসে। পরবর্তীতে পূজা অভিযোগ করেন যে, রণবীর তাঁকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করতেন এবং মদ্যপ অবস্থায় অকথ্য গালিগালাজ করতেন। তবে রণবীর শোরী এই সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে উলটো দাবি করেন যে, ওই সম্পর্কে তিনিই বেশি অত্যাচারিত হতেন।
এরপর ২০০৩ সালে মাত্র দু’মাস প্রেমের সম্পর্কের পরেই ভিজে (VJ) মণীশ মাখিজাকে বিয়ে করেন পূজা ভাট। কিন্তু সেই বৈবাহিক জীবনও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিয়ের ঠিক ১১ বছর পর, ২০১৪ সালে বিবাহবিচ্ছেদের মাধ্যমে তাঁরা চিরতরে আলাদা হয়ে যান।
বিচ্ছেদের যন্ত্রণা ও মদের আসক্তি
বিয়ে ভাঙার এই ধাক্কা মানসিকভাবে একেবারেই মেনে নিতে পারেননি অভিনেত্রী। পরবর্তীকালে জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘বিগ বস ওটিটি ২’-এর ঘরে এসে নিজের জীবনের সেই কঠিন সংগ্রামের কথা অকপটে স্বীকার করেন পূজা। তিনি জানান, বিবাহবিচ্ছেদের পর তিনি মানসিকভাবে দারুণভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এবং সেই যন্ত্রণা ভুলতেই মদের নেশা তাঁর নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল। অ্যালকোহলের নেশায় বুঁদ হয়েই তিনি অতীতের সমস্ত হতাশা ভুলতে চাইতেন। অবশেষে ২০১৬ সালে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর তিনি মদ্যপান সম্পূর্ণ ছেড়ে দেন।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে বলিউডে পা রেখে ‘সড়ক’, ‘দিল হ্যায় কি মানতা নেহি’, ‘স্যার’, ‘তামান্না’, ‘বর্ডার’-এর মতো একাধিক ব্যবসাসফল ও জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করা পূজা ভাট আজ জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নিজস্ব শর্তে জীবনযাপন করছেন। পুরনো বিতর্ক ও বিষাদকে পেছনে ফেলে মাঝেমধ্যে তাঁকে ক্যামেরার সামনে দেখা গেলেও, তাঁর সেই অতীতের বিতর্কিত মুহূর্তগুলি আজও ভারতীয় পপ কালচারের ইতিহাসে এক স্থায়ী ক্ষত হয়ে রয়েছে।