হরমুজ প্রণালী নিয়ে মাসকাটের মাস্টারপ্ল্যান! ইরানকে ওমানের মেগা প্রস্তাব, কিন্তু বেঁকে বসল আমেরিকা ও তেহরান!

আমেরিকা-ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz)-তে অস্থিরতা এখন চরম শিখরে। বিশ্ব তেল বাণিজ্যের এই লাইফলাইনে বারবার বাধা সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে উত্তেজনা প্রশমন ও নিরাপদ আন্তর্জাতিক নৌচলাচল সুনিশ্চিত করতে ইরানকে এক বিশেষ প্রস্তাব দিল ওমান।
উপসাগরীয় দেশগুলির (GCC) সমর্থনে ওমান সরকারের পক্ষ থেকে তেহরানের কাছে হরমুজ প্রণালীর নৌচলাচল যৌথভাবে পরিচালনার জন্য একটি আঞ্চলিক রূপরেখা বা প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে।
ওমানের প্রস্তাবে ঠিক কী রয়েছে?
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের একচ্ছত্র আধিপত্যের পরিবর্তে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের সুরক্ষায় একটি যৌথ সহযোগিতামূলক কাঠামো তৈরি করাই এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য।
ঐচ্ছিক মাশুল ব্যবস্থা: পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রণালী অতিক্রমকারী বাণিজ্যিক জাহাজ সংস্থাগুলি স্বেচ্ছায় একটি নির্দিষ্ট ফি বা অনুদান দেবে। এই অর্থ সামুদ্রিক সুরক্ষা, নেভিগেশন সুবিধা এবং পরিবেশগত সুরক্ষার কাজে ব্যবহার করা হবে।
মলাক্কা প্রণালীর মডেল: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিখ্যাত ‘স্ট্রেট অব মলাক্কা’ (Strait of Malacca)-তে ব্যবহৃত ইউজার-ফান্ডেড (User-funded) ব্যবস্থার আদলেই হরমুজে এই মডেল বাস্তবায়নের কথা ভাবা হয়েছে।
ওমানের মধ্যস্থতা: ইরান, অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ এবং পশ্চিমী শক্তিগুলির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে আসছে ওমান। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই ব্যাক-চ্যানেল আলোচনার মাধ্যমে এই প্রস্তাব তেহরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন ওমানি আধিকারিকরা।
কেন এই প্রস্তাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্বজুড়ে তেলের মোট সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ খনিজ তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হয়। এছাড়া ইরাক, কুয়েত, কাতার এবং বাহরাইনের মতো উপসাগরীয় দেশগুলির জন্য একমাত্র সামুদ্রিক পথ হলো এই প্রণালী।
আমেরিকা-ইরান শান্তি চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্ব তেলের বাজার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সেই কারণেই নিজেদের তেল সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে এমন বিকল্প ব্যবস্থার পথ খুঁজছে জিসিসি ভুক্ত দেশগুলি।
প্রস্তাবে সম্মত নয় ইরান ও আমেরিকা—উভয় পক্ষই!
ওমানের এই আন্তরিক উদ্যোগের পরেও জলঘোলা মেটার বদলে অচলাবস্থা কাটেনি। কারণ দুই প্রধান অক্ষই এই প্রস্তাবে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে:
ইরানের তীব্র আপত্তি: রয়টার্সকে এক শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তেহরান এই পরিকল্পনার কোনো “সফলতার সম্ভাবনা দেখছে না”। মূলত, মার্কিন-ইসরায়েল জোটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এই কৌশলগত জলপথটি ইরানের অন্যতম প্রধান ‘রাজনৈতিক চাল’ (Bargaining Chip)। ফলে এই প্রণালীতে নিজের একক আধিপত্য বা নিয়ন্ত্রণ ক্ষুণ্ণ হয়, এমন কোনো প্রস্তাবে সায় দিতে নারাজ তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা: অন্যদিকে আমেরিকাও আন্তর্জাতিক জলপথে যেকোনো ধরনের ফি বা টোল আদায়ের কঠোর বিরোধিতা করেছে। ওয়াশিংটনের স্পষ্ট বক্তব্য, হরমুজ প্রণালী একটি আন্তর্জাতিক জলপথ এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী বাণিজ্যিক জাহাজগুলির এখানে কোনো শুল্ক ছাড়াই অবাধ ও মুক্ত চলাচলের অধিকার রয়েছে।
উপসংহার:
ওমানের পেশ করা প্রস্তাবটি বিশ্ব বাণিজ্যের স্বার্থে একটি বাস্তবসম্মত পথ দেখালেও, ওয়াশিংটন ও তেহরানের পারস্পরিক অনড় অবস্থানের কারণে হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ ঘিরে অনিশ্চয়তার মেঘ কিন্তু থেকেই যাচ্ছে!